কলকাতা

কলকাতায় সিপির দায়িত্বে বাঙালি অফিসার সুপ্রতিম সরকার

শুক্রবার নবান্ন পুলিশের যে রদবদল করেছে, তাতে কলকাতার পুলিশ কমিশনার বদল প্রত্যাশিত ছিল না। ঠিক যেমন প্রত্যাশিত এবং অনিবার্য ছিল নতুন ভারপ্রাপ্ত ডিজি-র নাম। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব কুমারের চাকরিজীবন শেষ হচ্ছে শনিবার। তার আগে তাঁর পদে নতুন কাউকে নিয়োগ করতেই হত নবান্নকে। সেই নিয়মেই এসেছে পীযূষ পাণ্ডের নাম। কিন্তু কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদের বদল খানিকটা অপ্রত্যাশিত ছিল বইকি। প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাজ্য তথা কলকাতা পুলিশের যে রদবদল হয়েছে, তা নিয়ে নবান্ন এবং ক্যামাক স্ট্রিট উভয় তরফই সহমত। মনোজকে সরিয়ে সুপ্রতিমকে আনার সিদ্ধান্তও সুচিন্তিত। পুলিশ-প্রশাসনের পাশাপাশি রাজ্য রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদে রদবদল নিয়ে। কেন ভোটের মুখে কলকাতা পুলিশের সর্বোচ্চ পদে রদবদল করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা?

এর একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, আইপ্যাক মামলা। গত ৮ জানুয়ারি কয়লা মামলার সূত্রে আইপ্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সংস্থার দফতরে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি। তল্লাশি চলতে চলতে লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়ি এবং আইপ্যাকের সল্টলেকের দফতরে ঢুকে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। প্রতীকের বাড়ি থেকে ফাইল, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং আইপ্যাকের দফতর থেকে মমতা বেশকিছু নথিপত্র নিয়ে যান। মুখ্যমন্ত্রী প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছোনোর অব্যবহিত আগে সেখানে গিয়েছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ। আর সল্টলেকের দফতরে পৌঁছে গিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব। মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে তদন্তের কাজে ‘বাধা’ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে ইডি। সেই মামলায় প্রথম শুনানির দিন বিচারপতিরা যা বলেছেন, তা রাজ্য সরকার তথা প্রশাসনের কাছে ‘বিড়ম্বনাজনক’। আগামী মঙ্গলবার ওই মামলার আবার শুনানি। প্রথম শুনানিতে শীর্ষ আদালতের বক্তব্যে খুব ভাল ‘সঙ্কেত’ দেখেনি নবান্ন। রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তরের ধারণা, মঙ্গলবারের শুনানিতে রাজীব এবং মনোজের বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ করার নির্দেশ দিতে পারে শীর্ষ আদালত। তেমন হলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার শাস্তি পাবেন। যা বাহিনীর পক্ষে ভাল নয়। রাজীব যেহেতু অবসর নিলেন, তাই তাঁকে শাস্তি দিলেও রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শাস্তি পেতে হবে না। সে ক্ষেত্রে বলা হবে, এক আইপিএস এবং এক প্রাক্তন আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হল। অর্থাৎ, দুই বাহিনীর শীর্ষপদের আধিকারিকদের নয়, শাস্তি দেওয়া হল দুই অফিসারকে। মনোজকে রাজ্য পুলিশের নিরাপত্তা নির্দেশক (ডিরেক্টর সিকিউরিটি) করা হয়েছে। ওই পদে যিনি থাকেন, তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁকে সবসময়েই মুখ্যমন্ত্রীর কাছাকাছি থাকতে হয়। পুলিশবাহিনীর সাপেক্ষে সেটি বড় পদ হলেও জনমানসে সেই পদ সম্পর্কে তেমন স্বচ্ছ ধারণা নেই। ওই পদের ওজন সম্পর্কেও সাধারণ নাগরিকেরা ওয়াকিবহাল নন। ফলে কলকাতার পুলিশ কমিশনার শাস্তির মুখে পড়লে যে অভিঘাত তৈরি হত, ‘রাজ্য পুলিশের নিরাপত্তা নির্দেশক’ মনোজকে শাস্তি পেতে হলে তা হবে না। মমতার শাসনে কলকাতার বাইরে বিধাননগর, হাওড়া শহর, চন্দননগর, ব্যারাকপুর, শিলিগুড়ি, আসানসোল-দুর্গাপুরে কমিশনারেট তৈরি করা হলেও কলকাতার পুলিশ কমিশনার পদের পৃথক ওজন রয়েছে। সেই পদকে আইনি ঝঞ্ঝাট থেকে বাঁচাতে চেয়েছে নবান্ন। আজ কলকাতা পেয়েছে নতুন সিপি সুপ্রতীম সরকারকে। সূত্রের খবর, আর দায়িত্ব পেয়েই পরের দিন অর্থাৎ শনিবার বড় নির্দেশ দিলেন তিনি। পুলিশ কমিশনারের নাম নিয়ে কেউ পুলিশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে পুলিশ যেন কোনওরকম ‘ফেভার’না করে। স্পষ্ট নির্দেশ সুপ্রতীমের।প্রথম দিনে পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব নিয়েই বার্তা কলকাতা পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারের। সূত্রের খবর, তিনি আরও বলেছেন, যতক্ষণ না পুলিশ কমিশনার নিজে কিছু বলছেন কেউ যেন তাঁর নাম শুনে প্রভাবিত না হন। সংশ্লিষ্ট বৈঠক থেকে তিনি ট্রাফিক গার্ডের অফিসারদেরদেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্রের খবর, তিনি বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অর্থাৎ পিক আওয়ারে অফিসার থেকে শুরু করে কনস্টেবলকে রাস্তায় নেমে ডিউটি করতে হবে। ভিজিবল থাকতে হবে। কোথাও কোনও ট্রাফিক গার্ডের অন্দরে ঘটনা ঘটলে থানা বা ট্রাফিক গার্ডের বর্ডার এলাকায় কিছু হলে এ-ওর দিকে ঠেললে চলবে না। একটাই ইউনিট – কলকাতা ট্রাফিক পুলিশ। এখানেই শেষ নয়, কলকাতা পুলিশের ডাউনিং এবং লিভিং রুম হল থানা এবং ট্রাফিক। সেগুলি যেন সাজানো গোছানো থাকে। কিচেন হল ডিডি এবং এআরএস। এগুলো হল কলকাতা পুলিশের স্বাস্থ্য। ফলে সেগুলোও পরিষ্কার রাখার নির্দেশ দেন তিনি। বস্তুত, আজ কলকাতা পুলিশের দায়িত্ব নিয়েই সব থানার এবং ট্র্যাফিক গার্ডের অফিসারদের নিয়ে বৈঠক সারলেন কলকাতা পুলিশ কমিশনারে সুপ্রতিম সরকার। বস্তুত, কলকাতা পুলিশ কমিশনারের পদে এত ছিলেন মনোজ বর্মা। তাঁকে সরিয়ে এবার দেওয়া হয়েছে ডিরেক্টর অব সিকিউরিটির পদ। অন্যদিকে নগরপালের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন আইপিএস সুপ্রতিম সরকার। এতদিন রাজ্য পুলিশের এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। এবার দায়িত্ব সামলাবেন এই শহরের পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব।