কোটি কোটি বছরের সাক্ষী যে পর্বতমালা উত্তর ভারতকে মরুভূমি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছে, আজ সেই আরাবল্লীর শরীর মাপতে বসেছে ১০০ মিটারের ফিতে! সুপ্রিম কোর্টের নতুন সংজ্ঞায় বিপন্ন হতে চলেছে এই আদিম পর্বতশ্রেণির প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা! আর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই এখন গর্জে উঠেছে রাজস্থান থেকে দিল্লি- আপামর প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের সুপারিশ মেনে সুপ্রিমকোর্ট জানিয়েছে, সমতল থেকে ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু ভূখণ্ডকেই কেবল ‘আরাবল্লী পর্বত’ বলে গণ্য করা হবে। পরিবেশকর্মীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ এখানেই। কারণ, আরাবল্লীর অধিকাংশ পাহাড়ই উচ্চতায় ১০০ মিটারের কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নতুন সংজ্ঞার আড়ালে আসলে খনি মাফিয়া এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশবিদ নীলম আলুওয়ালিয়ার গলায় ঝরে পড়ল একরাশ আক্ষেপ, “আরাবল্লী কেবল পাথর বা মাটির স্তূপ নয়, এটি এই অঞ্চলের ফুসফুস। ১০০ মিটারের কম উঁচু যে ছোট ছোট টিলাগুলোকে বাদ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোই থর মরুভূমির প্রসার রুখে দেয় আর ভূগর্ভস্থ জল ধরে রাখে। এই রায় আরাবল্লীর জন্য আসলে এক মৃত্যুদণ্ড।” উদয়পুর

থেকে গুরুগ্রাম- সর্বত্রই প্রতিবাদের সুর এক। সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে আইনজীবী ও ছাত্ররা শামিল হয়েছেন এই আন্দোলনে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব থেকে শুরু করে রাজস্থানের কংগ্রেস নেতা টিুকা রাম জুলি, সকলেই সতর্ক করেছেন এক ভয়াবহ পরিণতির। তাঁদের দাবি, আরাবল্লী না থাকলে দিল্লির অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। ধুলোর ঝড়ে ঢেকে যাবে আকাশ, শুকিয়ে যাবে নদীর উৎস। আন্দোলনকারীরা বলেন, “পৃথিবীর কোথাও পাহাড়কে শুধু উচ্চতা দিয়ে মাপা হয় না, দেখা হয় তার বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা। যে টিলাগুলো ছোট, তারা কি আমাদের জল দেয় না? তারা কি বন্যপ্রাণের আশ্রয় নয়? বিজ্ঞানের বদলে নিছক জ্যামিতিক উচ্চতা দিয়ে প্রকৃতিকে বিচার করা চরম মূর্খতা।” সরকার অবশ্য দাবি করছে, এই নতুন সংজ্ঞা আনা হয়েছে খনন কার্যে স্বচ্ছতা এবং নিয়মের সমতা আনতে। পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব জানিয়েছেন, মাত্র ২ শতাংশ এলাকায় খনি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা-ও কড়া নিয়ম মেনেই। কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে অন্য কথা। স্থানীয়দের দাবি, ‘উন্নয়ন’-এর এই দোহাই আর বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, আরাবল্লী আজ কেবল একটি পর্বতশ্রেণি নয়, এটি উত্তর ভারতের বাঁচার লড়াই। আজ যদি ১০০ মিটারের দোহাই দিয়ে এই প্রাচীন রক্ষাকর্তাকে বিলিয়ে দেওয়া হয়, তবে আগামী প্রজন্মকে হয়তো এক ধুলোমাখা মরুভূমির মধ্যে শ্বাস নিতে হবে।


