রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী বেড়েছে বলে বিরোধীরা যে অভিযোগ তুলছেন, তা নস্যাৎ করতে গিয়ে এবার খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । বৃহস্পতিবার বিধানসভা অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণের উপর জবাবি বক্তৃতায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় যদি অনুপ্রবেশকারীরাই থাকে, তবে সেই তালিকায় ভোট দিয়ে কীভাবে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হন ? নাগরিকত্ব, সীমান্ত রক্ষা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা – এদিন বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে একের পর এক ইস্যুতে বিজেপিকে আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী । এদিন বক্তব্যের শুরু থেকেই অনুপ্রবেশ ইস্যুতে বিজেপিকে কোণঠাসা করার কৌশল নেন তৃণমূল নেত্রী । বিজেপি বিধায়কদের হট্টগোলের মধ্যেই তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, “অনুপ্রবেশকারী কথাটা আপনাদের মাথায় ঢুকে গেছে । একটাও অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পেয়েছেন বাংলায় ? আমি চ্যালেঞ্জ করছি ।” তাঁর যুক্তি, 2024-এর লোকসভা নির্বাচন বা তার আগের 2014 ও 2019-এর নির্বাচন – সবই বর্তমান ভোটার তালিকার ভিত্তিতে হয়েছে । বিরোধীদের দাবি মতো সেই তালিকায় যদি সত্যিই ভূরি ভূরি অনুপ্রবেশকারী থাকে, তবে সেই ভোটে জিতে গঠিত সরকারেরও কি বৈধতা থাকে ? এই প্রশ্ন তুলে মমতা বলেন, “আপনার প্রধানমন্ত্রী তাহলে কেন পদত্যাগ করছেন না ? তার মানে তিনিও অনুপ্রবেশকারীর ভোটেই জিতেছেন । আপনার গভর্নমেন্ট তৈরি হয়েছে, আপনি এটা বলতে চান ? প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেলফ ফার্স্ট । চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম ।”
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বাংলা দিয়ে নয়, বরং অনুপ্রবেশ ঘটে মণিপুর, নাগাল্যান্ড ও অসম সীমান্ত দিয়ে । অন্য রাজ্যে সমস্যা থাকলেও বারবার রাজনৈতিক কারণে বাংলাকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি ।
রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের সংক্ষিপ্ত ভাষণ নিয়ে বিরোধীরা যে কটাক্ষ করেছিলেন, এদিন তারও জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী । বিধানসভার রীতিনীতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজ্যপালের গলায় সমস্যা ছিল, তাই তিনি স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বাকি ভাষণটি সভার টেবিলে ‘লে’ (Lay) করেছেন । বিরোধীদের নিয়ম না-জানার খোঁচা দিয়ে মমতা বলেন, “সিস্টেমটা পার্লামেন্টারি সিস্টেমে আছে । আমিও রেল মিনিস্টার থাকাকালীন স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বাজেট বক্তৃতার অনেক অংশ ‘লে’ করেছি । রাজ্যপালের বলার কথা ছিল, কিন্তু তাঁর থ্রোট-এ একটা প্রবলেম ছিল । তিনি স্পিকারের অনুমতি চেয়েছিলেন বাকিটা ‘লে’ (Lay) করার জন্য এবং চেয়ার তাঁকে অনুমতি দিয়েছে । এটা নিয়ে অহেতুক রাজনীতি করা হচ্ছে ।” রাজ্যপালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিরোধীরা বলার মতো কিছু না-পেয়ে অকারণ সমালোচনা করছে ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে বলতে গিয়ে এদিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে চরম অসহযোগিতার অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী । তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকার সিআরপিএফ, সিআইএসএফ থেকে শুরু করে বিএসএফ – সবাইকে জমি দিয়েছে । কিন্তু বিএসএফ এখন তাদের এক্তিয়ার 15 কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে 50 কিলোমিটার করে গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছে ।
মমতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বর্ডারে নিয়ম ছিল 15 কিলোমিটারের মধ্যে বিএসএফ ঢুকতে পারে, আর এখন 50 কিলোমিটার ঢুকে জনসাধারণের ওপর অত্যাচার করছে । আমি এই অত্যাচার মানব না । যা জমি দিয়েছি আগে কাজ কমপ্লিট করুন, বাদবাকি জমি আমরা দিয়ে দেব । কিন্তু আগে আপনাদের রুল চেঞ্জ করুন ।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অর্ধেক জমি কেন্দ্র দখল করে রেখেছে । এমনকি আর্মির কারণে মহাত্মা গান্ধির মূর্তির পাদদেশেও তাঁদের সই করতে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি । পাশাপাশি 10 বছর ধরে বর্ডার এলাকার কাস্টমস ও এভিয়েশন ডেটা রাজ্যের সঙ্গে শেয়ার করা হচ্ছে না বলেও জানান তিনি ।
কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নিয়ে বলতে গিয়ে এদিন ফের জিএসটি এবং আটকে থাকা ফান্ডের প্রসঙ্গ টানেন মমতা । তিনি অভিযোগ করেন, ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যানের জন্য 15 বছর অপেক্ষা করেও কেন্দ্রের থেকে এক পয়সা পাওয়া যায়নি । বাধ্য হয়ে রাজ্য সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে 1000 কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং কাজও শুরু হয়েছে । কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে মমতা বলেন, “মাছের তেলে মাছ ভাজা হচ্ছে । একটাই ট্যাক্স – জিএসটি । সেই ট্যাক্সের সব টাকা তুলে নিয়ে যায় সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট । সেখান থেকেই আমাদের ভাগের টাকা দেয় । এটা আপনাদের পকেটের টাকা নয়, দয়া দক্ষিণাও নয় । বাংলার মানুষের হকের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে ।” 100 দিনের কাজ, গ্রামীণ সড়ক যোজনা এবং আবাসের টাকা বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে এদিন তিনি তীব্র ভর্ৎসনা করেন বিজেপি বিধায়কদের ।
বক্তৃতার শেষে রাজনৈতিক স্লোগান দিতে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রীকে । বিজেপিকে উদ্দেশ্য করে তাঁর মন্তব্য, “আপনারা জিরো ছিলেন, জিরো থাকবেন । বাংলা হিরো ছিল, বাংলা হিরো থাকবে ।” তিনি আরও বলেন, “চলবে না হামলা, এটার নাম বাংলা । চলবে না জুমলা, এটার নাম বাংলা ।” পাশাপাশি আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো এবং 10 লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি ।


