ভোটমুখী বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়াকে ঘিরে বুধবারও উত্তপ্ত বিহার তথা দেশের রাজনীতি ৷ বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদবের সঙ্গে সরাসরি বচসা বাধে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের ৷ লালু-তনয়কে কটাক্ষ করতে গিয়ে মুখ্য়মন্ত্রী জানান, তেজস্বী যখন ছোট ছিলেন তখন বিহারের পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ ৷ এনডিএ-র শাসনে বিহার বদলেছে ৷ তিনি আরও জানান, অতীতে বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করলেও আগামিদিনে এনডিএতেই থাকবেন ৷ গতকাল বিহার বিধানসভায় কালো পোশাকে এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর)-এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিরোধী দলের বিধায়করা ৷ এদিনও একই দৃশ্য দেখা গেল বিধানসভায় ৷ শুধু তাই নয়, এসআইআর-কে নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদের অধিবেশনও ৷ নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে অধিকাংশ বিধায়কই এদিনও কালো শার্ট, কুর্তা বা অন্য কালো পোশাক পরে বিধানসভায় আসেন ৷ প্ল্যাকার্ড হাতে তাঁরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন ৷ বিক্ষোভে সামিল হন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা লালু-পত্নী রাবড়ি দেবীও ৷ প্রশ্নোত্তর পর্বে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদব তাঁর বাবা আরজেডি প্রধান লালু প্রসাদ যাদবের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, “লালুজি বলতেন, ভোট দিয়ে সমাজে প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষও সরকার গঠনে নিজের অবদান রাখতে পারেন ৷ 18 বছর বয়স থেকে শুরু করে সবাইকে ভোটাধিকার দিয়েছে সংবিধান ৷ তিনি গরিব হোক বা ধনী, ক্ষমতাশালী হোন বা দুর্বল, সবার অধিকার সমান ৷” এসআইআর নিয়ে তেজস্বী বলেন, “আমরা এর বিরুদ্ধে নই ৷ কিন্তু এই পদ্ধতি ও তাতে স্বচ্ছতার অভাবের বিরোধিতা করছি ৷ নির্বাচন কমিশনের সৎভাবে পক্ষপাত না করে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করা উচিত ৷ কিন্তু তারা তা করছে না ৷ তাই আমরা বিধানসভায় প্রতিবাদ জানাচ্ছি ৷” বিরোধী দলনেতা আরও বলেন, “এটা লজ্জার যে এসআইআর-র মতো একটি বিশাল প্রক্রিয়া চলছে, কিন্তু মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার কোনও সাংবাদিক বৈঠক পর্যন্ত করেননি ৷ এই প্রক্রিয়ার সমর্থনে কোনও কথা বলেননি ৷ এর আগে এই ধরনের প্রক্রিয়া হয়েছিল 2003 সালে ৷ সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী ৷ তখন এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে দু’বছর সময় লেগেছিল ৷” দীর্ঘ সময় পরে ফের ভোটার তালিকার এই বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে রাজ্যে ৷ এদিকে এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, সওয়াল করেন তেজস্বী ৷ তিনি বলেন, “তাহলে এর অর্থ কি ভুয়ো ভোটারেরা মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নির্বাচিত করেছিলেন ? নাকি আমি এবং বাকি সব বিধায়করা ভুয়ো ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি ?” প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের ছোট ছেলে তেজস্বী জানান, এসআইআর নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে ৷ এই কাজ করার জন্য সময়টাই উপযুক্ত নয় ৷ এখন বর্ষাকাল ৷ বন্যার সময় ৷ কমিশন নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে 11টি নথি চেয়েছে ৷ বিহারের মাত্র 2.3 শতাংশ মানুষের কাছে এই নথি রয়েছে ৷ গরিবদের কাছে এই সমস্ত নথি নেই ৷আরজেডি নেতার কথায়, “আধার কার্ডকে প্রামাণ্য নথি হিসাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না কেন ? ইসিআই ভোটার কার্ডের সঙ্গে আধার লিঙ্ক করিয়েছিল, যাতে তা নকল করা না যায় ৷ রেশন কার্ড এবং মনরেগার কার্ডও গ্রহণযোগ্য নয় ৷ সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে ভর্ৎসনা করেছে এবং আধার কার্ডকে নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি হিসাবে বিবেচনা করতে বলেছে ৷” তেজস্বী বলেন, “সবমিলিয়ে বিহারের প্রায় 4.5 কোটি মানুষ রাজ্যের বাইরে থাকেন ৷ কেউ কাজের জন্য, কেউ সামান্য সময়ের জন্য, কেউ লেখাপড়ার জন্য আবার কেউ অন্য কোনও কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য অন্যত্র বাস করেন ৷ কিন্তু তাঁরা সকলে ভোট দিতে রাজ্যে ফিরে আসেন ৷ এবার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় ভুগছেন তাঁরা ৷” এই সময় বিরোধী দলনেতার বক্তব্যে বাধা দেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহা ৷ তিনি অভিযোগ করেন, তেজস্বী মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন ৷ বিভ্রান্ত করছেন ৷এদিকে তেজস্বী প্রশ্ন করেন, “এসআইআর মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে চলছে ৷ মঙ্গলবার ইসিআই 780 পৃষ্ঠার একটি হলফনামা জমা দিয়েছে ৷ এতে কোনও বিদেশি, বাংলাদেশি, নেপালি, মায়ানমার অনুপ্রবেশকারীর কথা উল্লেখ নেই ৷ তাহলে কীভাবে কেউ ভোটার তালিকায় বহিরাগতদের উপস্থিতি নিয়ে কথা বলতে পারে ?” তিনি আরও জানান, বিজেপির 52 হাজার 986 জন বুথ স্তরের এজেন্টদের (বিএলএ) কেউই নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনও বহিরাগত বা বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতির কথা জানাননি ৷ এই সময় বিধানসভায় হইচই শুরু হয় ৷ শাসক ও বিরোধী বিধায়কদের মধ্যে বচসা বাধে ৷ তখন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার উঠে দাঁড়িয়ে ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন ৷ কিন্তু বিরোধী বিধায়করা হট্টগোল চালিয়ে যান ৷ মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার তেজস্বীকে জবাবে বলেন, “আমার কথা শুনুন ৷ আপনার (তেজস্বী) বাবা সাত বছর বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ৷ তখন আপনি খুব ছোট ৷ তারপর আপনার মা মুখ্যমন্ত্রী হন সাত বছরের জন্য ৷ সেই সময় কী পরিস্থিতি ছিল ? আমাদের 20 বছরের শাসনকালে আমি আরেকজনের জন্য ন’মাস মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়াই ৷ তারপর আপনার সঙ্গে দু’দুবার দেড় বছর সময় ধরে সরকার গঠন করি ৷ কিন্তু আপনারা যখন ঠিকমতো কাজকর্ম করছিলেন না, তখন আমি সরকার ত্যাগ করি ৷ এবার আমি সবসময় ওদের (এনডিএ) সঙ্গে থাকব ৷ এখনও আপনি যখন কিছু বলেন, তখন আপনার জন্য কাজ করি ৷ আপনি যখন খুব ছোট তখন আপনার বাবা-মায়ের শাসনকালে পটনা শহরের মানুষ সন্ধ্যার পর রাস্তায় বেরতেন না ৷ কোনও রাস্তা ছিল না ৷ পরিস্থিতি খুব খারাপ ছিল ৷ আমরা যে কাজ করেছি, তা ভুলে যাবেন না ৷”