অর্থ পাচার মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের বাড়িতে ইডি । মামলার প্রমাণ সংগ্রহের অংশ হিসেবে, ইডি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাটির যাবতীয় আর্থিক নথিপত্র এবং ব্যাঙ্ক হিসাবের বিবরণী অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে । ইডি আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই বর্তমান বিরোধী দলনেতা বিজয়নের তিরুবনন্তপুরমের বাসভবনটি থেকে মোবাইল ফোন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল যন্ত্র বাজেয়াপ্ত করেছে । সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম.এ. বেবি এই তল্লাশিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও জঘন্য আক্রমণ হিসেবে অভিহিত করেছেন ৷ দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বেবি বলেন, “সিপিআই(এম) জনগণের সামনে প্রমাণ করে দেবে যে এই তল্লাশি অভিযানগুলো ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত । বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ভি.ডি. সতীশনের মন্ত্রিসভার দুজন মন্ত্রীও নাকি ‘কোচিন মিনারেলস অ্যান্ড রুটাইল লিমিটেড’ (CMRL) থেকে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত ছিল । এ ধরনের পদক্ষেপ সিপিআই(এম) কিংবা বিজয়নকে বিন্দুমাত্র ভীত করতে পারবে না; আর যারা ভেবেছিলেন যে এতে তারা ভয় পাবেন, তারা এই দল বা এর নেতাকে খুব একটা ভালোভাবে চেনেন না ।” একজন কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে বিজয়নের অতীতের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সিপিআই(এম) নেতা বেবি বলেন, “ইন্দিরা গান্ধির ঘোষিত জরুরি অবস্থার সময় বিজয়ন যখন একজন বিধায়ক ছিলেন, তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং তাকে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল ।”
এক্স পোস্টে বেবি এই তল্লাশি অভিযানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তুলে লেখেন, “কেরলে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF) কি এই তল্লাশি অভিযানের সঙ্গে জড়িত বা এর সহযোগী ?” তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই ঘটনাটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক আঁতাতের বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি রাখে ।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা জানিয়েছেন, সিএমআরএল অর্থ পাচার মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বুধবার কেরলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান পিনারাই বিজয়ন ও অন্যদের বাসভবনে তল্লাশি চালাচ্ছে ।
তাঁরা জানিয়েছেন, অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন (পিএমএলএ)-এর বিধান অনুযায়ী রাজ্যের মোট 10টি জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে, যার মধ্যে রাজধানী তিরুঅনন্তপুরমে বিজয়নের ভাড়া করা বাড়িও রয়েছে । অভিযোগ করা হয়েছে যে, কোচিন মিনারেলস অ্যান্ড রুটাইল লিমিটেড (সিএমআরএল) নামে একটি বেসরকারি সংস্থা 2018 থেকে 2019 সালের মধ্যে বিজয়নের মেয়ে টি বীণার সংস্থা এক্সালজিক সলিউশনস-কে 1.72 কোটি টাকার অবৈধ অর্থ প্রদান করেছে, যদিও আইটি সংস্থাটি সেই সংস্থাকে কোনও পরিষেবা প্রদান করেনি ।
সিএমআরএল মামলার সূত্রে ইডি একযোগে কেরলের 10টি প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে । প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর কন্যাও এর আওতায় রয়েছেন । বিষয়টি হল, ভুয়ো খরচের আড়ালে সিএমআরএল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তহবিল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে । প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয়নের কন্যা এই সুবিধাভোগীদের মধ্যে একজন ।
এই অভিযানের সময়, ইডি আধিকারিকরা বীণা বিজয়ন এবং CMRL-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর শশীধরন কার্থাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন । বর্তমানে কোচির CMRL-এর কর্পোরেট কার্যালয় এবং কার্থার প্রধান বাসভবনে ব্যাপক তল্লাশি ও পরিদর্শন কার্যক্রম চলছে । জানা গিয়েছে, ইডি আধিকারিকরা যখন তিরুবনন্তপুরমে পিনারাই বিজয়ন ও তাঁর কন্যার বাসভবনে পৌঁছান, তখন তাঁরা দুজনেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন । তথ্য সংগ্রহের এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে চলছে । মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর অল্প সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির দ্বারা বর্তমানে বিরোধী দলনেতার ওপর এই তীব্র নজরদারি ও তদন্ত প্রক্রিয়া রাজ্যজুড়ে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ।
কেরল হাইকোর্ট যখন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে CMRL এবং এক্সালজিকের মধ্যেকার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়, ঠিক তার পরপরই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হল । মঙ্গলবার, কেরল হাইকোর্ট এই মামলায় ইডি তল্লাশি বাতিলের জন্য সিএমআরএল-এর দায়ের করা একটি আবেদন খারিজ করে দিয়েছে । ইডি 2024 সালে এই অভিযোগগুলো তদন্ত করার জন্য একটি পিএমএলএ মামলা দায়ের করেছিল । পরিবর্তে আদালত ইডি-র এই যুক্তিকে বহাল রাখে যে, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বিপুল পরিধি ও ব্যাপ্তির কারণে অর্থ পাচার সংক্রান্ত আইনের আওতায় একটি বিস্তারিত তদন্ত পরিচালনা করা অপরিহার্য ।
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে এমন কিছু অভিযোগ যে, ‘এক্সালজিক’ সংস্থাটি গত বেশ কয়েক বছর ধরে ‘ব্ল্যাক স্যান্ড’ বা কালো বালি উত্তোলনকারী সংস্থা CMRL-এর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছে, অথচ বিনিময়ে তারা কোনও প্রকৃত আইটি পরিষেবা প্রদান করেনি । আয়কর বিভাগের ‘অন্তর্বর্তীকালীন নিষ্পত্তি পর্ষদ’ (Interim Settlement Board)-এর পক্ষ থেকে কিছু তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পরেই এই আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ৷ পরবর্তীতে এই ঘটনার সূত্র ধরেই ‘গুরুতর জালিয়াতি তদন্ত দফতর’ (Serious Fraud Investigation Office) একটি বিস্তারিত তদন্ত শুরু করে । ক্রমবর্ধমান অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে, বর্তমান বিরোধী দলনেতা ভি. ডি. সতীশন এবং অন্যান্য প্রবীণ রাজনীতিবিদরা ইতিপূর্বে এই ঘটনার একটি উচ্চ-পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত ইডি-র এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে ।
তদন্তকারীরা বর্তমানে খতিয়ে দেখছেন যে, ব্ল্যাক স্যান্ড উত্তোলনের অনুমোদন প্রদানের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের অবৈধ আর্থিক লেনদেন বা সুবিধা আদান-প্রদানের ঘটনা ঘটেছিল কি না । CMRL-এর পদস্থ আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতেই এই তল্লাশি অভিযানের পরিধি একাধিক স্থানে বিস্তৃত করা হয়েছে ।

