দেশের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণের তোড়জোড় শুরু করল বিরোধী শিবির ৷ তিনি বিজেপির স্বার্থে কাজ করছেন- এই অভিযোগে বারবার সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি ৷ সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁকে কড়া আক্রমণ শানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ এই প্রসঙ্গে তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “তৃণমূল ছাড়া ও অন্যান্য বিরোধী দলের প্রায় 150 জনেরও বেশি সাংসদ সমর্থন জানিয়েছেন ৷ এরপর লোকসভা স্পিকারের কাছে জমা পড়বে এই প্রস্তাব ৷” উল্লেখ্য রাজ্যে এসয়াইয়ার নিয়ে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ভুমিকায় অসন্তুষ্ট তৃণমূল কংগ্রেস তাঁ্র বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার কথা ঘোষণা করেছে আগেই। সে বিষয়ে এদিন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তৃণমূল ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলও এই প্রস্তাবে সমর্থন জানাচ্ছে। এই উত্তপ্ত আবহে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে হঠানোর প্রস্তাবে স্বাক্ষর করলেন বিরোধীদের 193 জন সাংসদ ৷ সূত্রের খবর, শুক্রবার সংসদের দুই কক্ষের মধ্যে কোনও একটি কক্ষে এই প্রস্তাব পেশ করা হবে ৷ এই প্রথম দেশের মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের অপসারণের দাবিতে প্রস্তাব পেশ হতে চলেছে ৷ এই 193 জন সাংসদের মধ্যে লোকসভার 130 জন এবং রাজ্যসভার 63 জন সাংসদ রয়েছেন ৷ রুল অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের অপসারণে লোকসভার অন্তত 100 জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন ৷ সঙ্গে রাজ্যসভার 50 জন সাংসদকে স্বাক্ষর করতে হবে ৷ তবেই জ্ঞানেশ কুমারকে হঠানোর প্রস্তাব সংসদে পেশ করা সম্ভব ৷ এক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে ৷ এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেছেন তৃণমূল ও ‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের দলগুলির অন্য সদস্যরা ৷ আম আদমি পার্টি (আপ) বিরোধীদের এই জোটের সদস্য না-হলেও তারা জ্ঞানেশ কুমারকে হঠাতে স্বাক্ষর করেছে ৷ উচ্চস্তরীয় সূত্রের খবর, মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগে নোটিশ পেশ করা হবে ৷ কার্যক্ষেত্রে অর্থাৎ কমিশনে পক্ষপাতমূলক এবং বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে শুরু করে নির্বাচনে কারচুপির তদন্তে ইচ্ছাকৃত বাধা দেওয়া এবং গণহারে ভোটাধিকার বঞ্চনা ৷ এছাড়া আগাগোড়াই বিরোধীদের অভিযোগ মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার বিজেপিকে সুবিধে করে দিচ্ছে ৷ শাসকদলের সঙ্গে তাঁর গোপন আঁতাঁত আছে ৷ বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে এবং অন্যান্য অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিজেপি যাতে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে সেই ব্যবস্থা করছে নির্বাচন কমিশন বলে অভিযোগ উঠেছে ৷ রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়া থেকে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ পড়া এবং জীবিত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় মৃত দেখানোর একাধিক ঘটনা ঘটেছে ৷ পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় ভোটার হিসাবে নাম নথিভুক্ত করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ ৷ কাজের চাপে বিএলও-দের মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে ৷ এই সমস্যাগুলির কথা জানিয়ে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বারবার চিঠি লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন ৷ সম্প্রতি 6-10 মার্চ ধর্মতলায় মেট্রো চ্যানেলে অবস্থান করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷
সুপ্রিম কোর্ট অথবা হাইকোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের মতো মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় ৷ অর্থাৎ অসদ আচরণ বা অক্ষমতা প্রমাণিত হলে তবেই তাঁকে অপসারিত করা সম্ভব ৷ সংসদের দুই কক্ষের যে কোনও একটিতে এই প্রস্তাব পেশ করার পর বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে ৷ লোকসভা বা রাজ্যসভার যে কক্ষে এই প্রস্তাব পেশ হবে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন প্রয়োজন ৷ পাশাপাশি সংসদে উপস্থিত সাংসদদের যাঁরা ভোটাভুটিতে অংশ নেবেন, তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন ৷ তাহলে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে অপসারণ করা সম্ভব ৷ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের মতো একইভাবে এবং এক পরিস্থিতি না-হলে মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারকে তাঁর কার্যালয় থেকে অপসারণ করা যায় না ৷ মুখ্য নির্বাচনী কমিশনারের সুপারিশ ব্যতীত অন্য কমিশনারদেরও অপসারণ করা যায় না ৷ এদিকে জাজেস এনকোয়ারি অ্যাক্ট, 1968 অনুযায়ী, একই দিনে সংসদের দুই কক্ষে অপসারণের নোটিশ পেশ হলে দুই কক্ষেই সেই প্রস্তাব গৃহীত হতে হবে এবং তারপরই তদন্ত কমিটি গঠন করা যায় ৷ এই কমিটি গঠন করবেন সংসদের চেয়ারম্যান ও অধ্যক্ষ যৌথভাবে ৷

