সমাজবিরোধীদের দমনে রাজ্য সরকারের আনা ‘গুন্ডা দমন বিল’ আপাতত আইন হওয়ার পথে আরও এক ধাপ পিছিয়ে গেল । কেন্দ্রীয় মাদক আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের একটি অংশের সংঘাতের আশঙ্কা দেখিয়ে সংশোধনের জন্য বিলটি রাজ্য সরকারের কাছে ফেরত পাঠিয়েছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু । ফলে বিধানসভায় পাশ হওয়ার পরও কার্যকর হল না ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল-2026’ ৷ কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করেই রাজ্য সরকারকে নিশানা করেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় । সমাজমাধ্যমে তাঁর কটাক্ষ, ‘পোস্টারে ডবল ইঞ্জিন । শাসনে রিভার্স গিয়ার । হোমওয়ার্ক সোজা ফেরত !” গত 29 জুন বিধানসভায় বিলটি পেশ করেছিল রাজ্যে প্রথমবার ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার । মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া । প্রস্তাবিত আইনে জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার অথবা ডিআইজি পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিককে কোনও সমাজবিরোধীকে নির্দিষ্ট এলাকা বা জেলা থেকে সর্বাধিক এক বছরের জন্য বহিষ্কারের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল । পাশাপাশি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত হাজিরার নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল । কিন্তু বিলের একটি ধারাই এখন কেন্দ্রের আপত্তির মূল কারণ । কেন্দ্রের দেওয়া নোটে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনে এমন ব্যক্তিদেরও ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে, যাঁরা কেন্দ্রীয় মাদক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন, অর্থাৎ NDPS Act-এর আওতায় পড়েন । অথচ মাদক পাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে 1988 সালের PITNDPS Act-এ ইতিমধ্যেই পৃথক কেন্দ্রীয় আইনি কাঠামো রয়েছে ৷ ফলে একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও রাজ্যের দু’টি আইনি ব্যবস্থা পাশাপাশি কার্যকর হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে ৷ এই জায়গাতেই সংবিধানের 254 নম্বর অনুচ্ছেদ ঘিরে আইনি জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ৷ কেন্দ্রের পরামর্শ, কেন্দ্রীয় আইনের সঙ্গে যে অংশে সংঘাত বা ওভারল্যাপ তৈরি হচ্ছে, সেই নির্দিষ্ট অংশ বাদ দিয়ে বিলটি সংশোধন করা হোক ৷ তারপর ফের বিধানসভায় তা পেশ করে রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো যেতে পারে ৷ প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার কথাতেও কার্যত সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে । তাঁর বক্তব্য, সরকার দ্রুত আইনটি কার্যকর করতে চেয়েছিল । ফলে বিল ফেরত আসা ‘বড় ধাক্কা’ । তবে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ফের বিধানসভায় বিলটি আনার সুযোগ রয়েছে ৷ বিলটি নিয়ে প্রথম থেকেই রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল । বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, এই আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে । সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য সেই আশঙ্কা খারিজ করে বলা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনেই এই কঠোর ব্যবস্থা । মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছিলেন, প্রতিরোধমূলক গ্রেফতারি বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনও কারণ নেই এবং প্রশাসন আইন মেনেই কাজ করবে । এর মধ্যেই বিলটির বৈধতা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক জনস্বার্থ মামলা হয় । গত 6 অগস্ট বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ তিনটি মামলাই খারিজ করে দেয় । আদালতের বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রপতির সম্মতি না পাওয়া পর্যন্ত বিলটি আইনেই পরিণত হয়নি । ফলে আইন হিসেবে কার্যকর না হওয়া কোনও বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে ওই মুহূর্তে মামলা করা অকালপক্ব । আর এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন । কারণ, হাইকোর্টে রাজ্যের তরফে বিলটি এখনও রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় থাকার কথা জানানো হলেও মুখ্যমন্ত্রী এর আগে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, রাজ্যপালের সম্মতি পাওয়ার পর ‘গুন্ডা দমন বিল’ আইনে পরিণত হয়েছে । এমনকি গত 24 জুলাই ধর্মতলায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এই নতুন আইন প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও তিনি বিধানসভায় জানিয়েছিলেন । ফলে মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য দাবি এবং আদালতে রাজ্যের হলফনামায় দেওয়া অবস্থানের মধ্যে ফারাক নিয়েই এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠছে । তার উপর রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে সংশোধনের জন্য বিল ফেরত আসায় আপাতত আইনটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া থমকে গেল । সংশোধিত বিল ফের কবে বিধানসভায় আসবে, কোন কোন ধারা বদলাবে এবং পরবর্তী দফায় রাষ্ট্রপতির সম্মতি মিলবে কি না, সেই প্রশ্নেই এখন নজর রাজ্য প্রশাসনের ।

