খেলা শেষের বাঁশি বাজার পর এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সাক্ষী থাকল বিশ্ব। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের উল্লাস নয়, বরং লিওনেল মেসির হাঁটু গেড়ে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার দৃশ্য। অন্যদিকে, নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে লড়াই করা কেপ ভের্দের খেলোয়াড়দের ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়া। ফুটবল মানচিত্রে যাদের অস্তিত্ব খুঁজতে আতশকাচ লাগে, সেই দলটাই কি না বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অহংকার প্রায় চূর্ণ করে দিচ্ছিল! হারজিতের হিসেব এই লড়াইয়ের পুরো গল্পটা বলতে পারে না। ১২০ মিনিটের এই স্নায়ুযুদ্ধ আসলে এক অদম্য জেদ আর নাছোড়বান্দা লড়াইয়ের দলিল হয়ে থাকল। এই লড়াইয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুখ সিডনি লোপেস কাবরাল। মাত্র ২৩ বছর বয়সি এই তরুণের জীবনসংগ্রাম হার মানাবে যে কোনও চিত্রনাট্যকেও। জার্মানির পঞ্চম ডিভিশন লিগে খেলার সময় মাসে তাঁর আয় ছিল মাত্র ৮৫০ পাউন্ড। হাড়কাঁপানো শীতে আবর্জনার পলিথিন দিয়ে জানলার পর্দা বানিয়ে দিন কাটাতে হত তাঁকে। শুধু দারিদ্র্য নয়, বারবার গ্যালারির বর্ণবিদ্বেষী আক্রমণের বিষও তাঁকে হজম করতে হয়েছে। সেই কাবরাল যখন ১০৩ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে এক অনবদ্য বাঁকানো শটে আর্জেন্টিনার জালে বল জড়ালেন, তখন তা শুধু একটা গোল ছিল না। ওটা ছিল জীবনের সব বঞ্চনা আর অপমানের বিরুদ্ধে এক মোক্ষম জবাব। বল জালে জড়িয়েই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন গ্যালারিতে বসা বান্ধবীর দিকে। তখন কে বলবে, এই দলটার জেতার সম্ভাবনা ছিল মাত্র চার শতাংশ! কাবরালের পাশাপাশি আরেকজনের কথা না বললেই নয়। তিনি ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সি এক গোলরক্ষক, যাঁর বর্তমানে কোনও ক্লাব নেই। পর্তুগালের দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাবের সঙ্গে তাঁর চুক্তি শেষ হয়েছে সদ্য। সেই বেকার মানুষটাই স্পেনের পর আর্জেন্টিনার তাবড় তারকাদের সামনে ইস্পাতের দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গোটা টুর্নামেন্টে ১৮টি অবিশ্বাস্য সেভ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, স্ট্যাটাস নয়, মাঠে আসল কথা বলে আত্মবিশ্বাস। তাঁর বিশ্বস্ত দস্তানা এদিন বারবার হতাশ করেছে প্রতিপক্ষকে। ১১১ মিনিটে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ডিনে বোর্জেসের গায়ে লেগে হওয়া আত্মঘাতী গোলটা হয়তো ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিল। ৩-২ ব্যবধানে জিতে মেসিরা মাঠ ছাড়লেন। কিন্তু কেপ ভের্দে যা দিয়ে গেল, তা ট্রফির চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। প্রাক্তন ফুটবলার গ্যারি নেভিলের কথায়, এটি আন্ডারডগদের সর্বকালের অন্যতম সেরা পারফরমেন্স। মায়ামির আকাশ হয়তো সেদিন কেপ ভের্দের খেলোয়াড়দের চোখের জলে ভিজেছিল। কিন্তু সেই কান্নায় হতাশা নয়, মিশে ছিল মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়ার তৃপ্তি। ফুটবল হয়তো চূড়ান্ত বিজয়ীদের মনে রাখে, কিন্তু কেপ ভের্দের এই হার না মানা লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিল।

