ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে রাজনৈতিক কাজিয়ার পারদ আগেই চড়েছিল। এবার সেই সংঘাত গড়াল আইনি দরবারে। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে 10 কোটি টাকার মানহানির ক্ষতিপূরণ দাবি করে আইনি নোটিশ পাঠালেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল। এক্স হ্যান্ডেলে তাঁর বিরুদ্ধে লাগাতার মিথ্যা, বিদ্বেষমূলক এবং অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে এই কড়া পদক্ষেপ করেছেন শীর্ষ আমলা। নিজের পোস্টের একটি অংশে মুখ্যসচিবকে ‘ভোট চোর’ বলে আক্রমণ করেন মহুয়া । মুখ্যসচিবের পক্ষে তাঁর আইনজীবী রুচিরা মান্না কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদকে এই নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশে স্পষ্ট ভাষায় 24 ঘণ্টার চরম সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে অবমাননাকর পোস্টগুলি মুছে ফেলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে সাংসদকে। সেই ক্ষমাপ্রার্থনার বার্তাটি মহুয়ার নিজস্ব এক্স হ্যান্ডলে অন্তত 30 দিন রাখতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন মন্তব্য আর করবেন না বলে লিখিত প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে। ক্ষতিপূরণের টাকার সঙ্গে আইনি নোটিশ পাঠানোর খরচ বাবদ আরও 50 হাজার টাকাও দাবি করা হয়েছে। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না-করলে মহুয়ার বিরুদ্ধে উপযুক্ত আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা রুজু করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, গত 3 ও 6 অক্টোবর এক্স হ্যান্ডলে দু’টি পৃথক পোস্টে মনোজ আগরওয়ালকে নিশানা করেন মহুয়া। 3 অক্টোবরের বার্তায় তিনি আমলাকে বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়ার মূল কারিগর বলে দাগিয়ে দেন। সেখানে মুখ্যসচিবের বিরুদ্ধে “সব রকম বেআইনি কাজ” করার অভিযোগ তোলেন সাংসদ। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখেন, “ইন্ডিয়া ইজ কামিং ফর ইউ নেক্সট” এবং “বাঁচতে পারবেন না”। এর তিন দিন বাদে, 6 অক্টোবরের একটি পোস্টে আমলাকে সরাসরি “ভোট চোর” বলে আক্রমণ করেন তিনি। সেখানে দাবি করা হয়, লক্ষ লক্ষ বৈধ বাঙালি ভোটারকে নাগরিক অধিকার থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করার জন্য একা মনোজ আগরওয়ালই দায়ী। সাংসদের এই চাঁচাছোলা আক্রমণকে স্রেফ রাজনীতির মোড়কে দেখতে নারাজ রাজ্যের মুখ্যসচিব। নোটিশে তাঁর বক্তব্য, এই মন্তব্যগুলি রাজনৈতিক সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত সততা, পেশাগত নিষ্ঠা এবং নিরপেক্ষতাকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর সাফ দাবি, দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনে তিনি কখনও ভোট চুরি, ভোটার তালিকায় কারচুপি কিংবা অন্যায়ভাবে কারও নাম বাদ দেওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন না। তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ এবং নির্ধারিত আইনের চৌহদ্দির মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মহুয়ার এই মন্তব্যের জেরে সমাজে মুখ্যসচিবের ভাবমূর্তি চরম আঘাত পেয়েছে। তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়েছে, 3 অক্টোবরের পোস্টটি 74 হাজারের বেশি মানুষ দেখেছেন এবং পুনর্প্রচার হয়েছে দু’হাজারের বেশি বার। অন্যদিকে, 6 অক্টোবরের পোস্টটিও দেখেছেন 22 হাজারের বেশি ব্যবহারকারী। এই বিপুল প্রচারের ফলে বহু বছর ধরে অর্জিত তাঁর সামাজিক ও পেশাগত সুনাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে দাবি আমলার। 2025 সালের 28 মার্চ থেকে 2026 সালের 11 মে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দায়িত্বে ছিলেন মনোজ কুমার আগরওয়াল। এরপর তিনি রাজ্যের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব নেন। সম্প্রতি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলে রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছিল। তার মধ্যেই আমলা-সাংসদ দ্বৈরথে মুখ্যসচিবের এই আইনি পদক্ষেপ সংঘাতের আগুনে নতুন মাত্রা যোগ করল।