রাজ্য রাজনীতিতে এবার কি আক্ষরিক অর্থেই মহারাষ্ট্র মডেলের পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে? মঙ্গলবার বিধানসভায় সদ্য তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবেশ এবং তার ঠিক পরপরই রাজ্যের মন্ত্রী তাপস রায়ের বিস্ফোরক দাবি ঘিরে এই জল্পনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাপস রায়ের দাবি, প্রায় পঞ্চাশ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন ঋতব্রত। এই অপ্রত্যাশিত ঘটনাপ্রবাহ উসকে দিয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনা। স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের হাত থেকে যেমন শিবসেনার রাশ বেরিয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই কি এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে ফসকে যেতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস? বিধানসভায় সাম্প্রতিক সই জাল-কাণ্ডের পর থেকেই ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে ফাটল ক্রমশ চওড়া হচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই জানিয়েছিলেন যে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা সই জালের বিষয়টি স্পিকারকে চিঠি দিয়ে অবগত করেছিলেন। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে এমন বিস্ফোরক পদক্ষেপ করার পরই এই দুই নেতাকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু সেই বহিষ্কারের চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই এবার চরম অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়তে চলেছে ঘাসফুল শিবির। মঙ্গলবার দুপুরে যখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় প্রবেশ করেন, ঠিক তার পিছনেই সেখানে পৌঁছন মন্ত্রী তাপস রায়। এদিন বিধানসভায় প্রবেশের আগেই সামাজিক মাধ্যমে একটি অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ এবং চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন তাপস রায়। তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে লেখেন, “তৃণমূল ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হল তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় 50 জন তৃণমূল বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গিয়েছে ঋতব্রত। খেলা হবে।” রাজ্যের মন্ত্রীর করা এই একটি পোস্টেই রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে যায়। বিরোধী শিবিরের অন্দরে যে কার্যত আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা এই পোস্ট থেকেই স্পষ্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিধানসভায় পৌঁছে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রীতিমতো তোপ দাগেন তাপস রায়। তিনি বলেন, “তৃণমূলের এখন শোচনীয় অবস্থা। দলটি কার্যত দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাউকেই আর দলের একাংশ মান্যতা দিচ্ছে না। নির্বাচন মেটার এক মাসও হয়নি, তার মধ্যেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।” দলের এই করুণ দশার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও জানান, তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের, বিশেষ করে নায়ক-নায়িকা বা গায়ক-গায়িকাদের রাজনীতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও গুজরাত, বিহার, দিল্লির মতো বাইরের রাজ্য থেকে লোক এনে লোকসভা বা রাজ্যসভায় পাঠানো হয়েছে। এমনকি পুরসভার কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান, মেয়র থেকে শুরু করে মন্ত্রিসভাতেও অরাজনৈতিক লোকেদের জায়গা দেওয়া হয়েছে, যাঁদের রাজনীতির সঙ্গে কোনও সম্পর্কই নেই। এই দীর্ঘদিনের দমবন্ধ করা পরিস্থিতির কারণেই দলের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভের আজ এমন মারাত্মক বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বলে মনে করছেন তিনি।

