
বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টে নজির তৈরি করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই মামলায় সওয়াল করলেন এজলাসে। বাংলায় SIR-এর প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম করছে নির্বাচন কমিশন, এই অভিযোগ তুলে আগেই মামলা দায়ের করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবার তিনি নিজে প্রধান বিচারপতির এজলাসে উপস্থিত হয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষায় সওয়াল করলেন। প্রধান বিচারপতির এজলাসে তুলে ধরলেন বাংলায় SIR-এ অনিয়মের একাধিক উদাহরণ। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ আদালত অবমাননা করছে কমিশন। সেগুলি মন দিয়ে শোনার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের সামনে আনার জন্য তাঁকে ধন্যবাদও জানান প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। মুখ্যমন্ত্রী, সলিসিটর জেনারেল, কমিশনের আইনজীবীর সওয়াল শোনার পর প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘এভাবে SIR পরিচালনা করা যায় না।’ এ দিন সুপ্রিম কোর্টের ১ নম্বর রুমে ৩৭ নম্বরে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলা। আদালতের মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চের সামনে শুরু হয় তাঁর করা মামলার শুনানি। সকাল সোয়া দশটার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মামলার টার্ন আসার আগে ১ নম্বর কোর্টরুমে ভিজিটার্স বেঞ্চের শেষ সারিতে আইনজীবীদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তাঁর মামলার শুনানি শুরু হতেই প্রবীণ আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্য আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারপতিদের বেঞ্চের সামনে এগিয়ে আসেন তিনি।
আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান মামলার সওয়াল শুরু করেন। শুরুতেই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর হয়ে সওয়ালে জানান, নির্বাচন কমিশন লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির কোনও তালিকা প্রকাশ করেনি। এর পরেই কমিশনের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনজীবী দিওয়ান বলেন,‘চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে মাত্র ১১ দিন হাতে রয়েছে। ১ কোটি ৩৬ লক্ষ লোককে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি তালিকায় ফেলা হয়েছে। ৬৩ লক্ষ হিয়ারিং বাকি। এই হিয়ারিং শেষ করার জন্য মাত্র ৪ দিন হাতে। ৮৩০০ মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে। ৭০ লক্ষ লোকের বানান ভুল আছে বলে তাঁদের সন্দেহের তালিকায় ফেলা হয়েছে। কী ভাবে শেষ হবে বাংলার SIR? পরিবারপঞ্জী (ফ্যামিলি রেজিস্টার), আধার কার্ড, ওবিসি শংসাপত্র— কোনওটাই আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও আলাদা ভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না।’
এখানেই শেষ নয়, বাংলা ভাষায় পদবির উচ্চারণের বিভিন্নতায় নাম বাদ যাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন আইনজীবী দিওয়ান। এ প্রসঙ্গে বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন,‘সে তো বাংলায় উচ্চারণ আলাদা হতেই পারে। যেমন ধরুন দত্ত বানান, আবার ব্যানার্জি-র ক্ষেত্রে বন্দ্যোপাধ্যায় তো প্রচলিত। এখনকার দিনে টেগোরকে কী ভাবে লেখা হবে, কেউ জানে না। তা বলে তো টেগোর মানে বদলে যাবে না।’
এর পরেই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের কাছে সওয়াল করার অনুমতি চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেন,‘মাই লর্ড, যদি আমাকে অনুমতি দেন, তা হলে SIR-এর নামে কী চলছে তা নিয়ে পাঁচ মিনিট বলতে চাই।’ উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাসে শুনানির সময়ে মামলাকারী হিসেবে তিনি যাতে বক্তব্য রাখতে পারেন, তা আগেই আদালতে আলাদা করে লিখিত আবেদন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর আবেদনে প্রধান বিচারপতি বলেন,‘ ৫ মিনিট কেন? আপনি ১৫ মিনিট বলতে পারেন, তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মামলায় আইনজীবীরা তো সওয়াল করছেন।’ যদিও পরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চ সম্মতি দিলে মমতা বলেন, ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। আমি আমার নিজের জন্য লড়াই করছি না, আমার দলের জন্য লড়াই করছি না। এরা মিসম্যাচ করছে কী ভাবে শুনুন। বিয়ের পরে মেয়েদের পদবী বদলে গেলেই মিসম্যাচ বলা হয়েছে। বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরা আপনার অর্ডার মানছে না। আধার কার্ড মানছে না, কাস্ট সার্টিফিকেট মানছে না। এরা ইচ্ছাকৃত ভাবে বাংলাকে বেছে নিয়ে নিশানা করছে। মাত্র চারটি বিরোধী শাসিত রাজ্যে এসআইআর করা হচ্ছে। এত তাড়াহুড়োর কী রয়েছে,যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ২৪ বছর বাদে SIR করতে হচ্ছে? অসমকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে না? ১০০-র উপরে লোক মারা গিয়েছেন, ভাবুন একবার, স্যর। লোকে আত্মহত্যা করেছে।’

