মদ্যপানের প্রতিবাদ করায় শিক্ষককে বেধড়ক মার ৷ কপালে জুটল কিল, চড়, লাথি, ঘুষি। রক্তাক্ত হলেন সমাজ গড়ার কারিগর ৷ ঘটনাস্থল সেই কামারহাটি। আক্রান্ত শিক্ষকের নাম নিরুপম পাল। দিনের বেলায় মদ্যপানের প্রতিবাদ করাতেই মদ্যপ যুবকদের হাতে মার খেতে হল তাঁকে। অভিযুক্তদের মধ্যে এক যুবতীও রয়েছেন। ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে ওই যুবতী চুলের মুঠি ধরে ‘শিক্ষা’ দিচ্ছেন প্রতিবাদী শিক্ষককে । ঘটনার দৃশ্য ধরা পড়েছে এলাকারই সিসিটিভি ফুটেজে ৷ যেখানে স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, মদ্যপানের প্রতিবাদ করার পর কয়েকজন উন্মত্ত যুবক-যুবতী ঝাঁপিয়ে পড়ছেন প্রতিবাদী শিক্ষকের উপর ৷ প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁকে বাইক থেকে নামিয়ে চলছে বেধড়ক মারধর। নিজেকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টাও করছেন তিনি। কিন্তু তাতেও যেন নিস্তার নেই। পাঁচ-ছয় জন রীতিমতো ঘিরে ধরে অনবরত লাথি, ঘুষি মারতে থাকেন তাঁকে ৷ ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শিউরে উঠেছেন এলাকার লোকজন। প্রতিবাদ করে একজন শিক্ষককে যদি এভাবে প্রকাশ্যে মার খেতে হয়। তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হবে, তা ভেবেই আতঙ্কিত স্থানীয় বাসিন্দারা। ঘটনার পর প্রতিবাদী শিক্ষক নিজেও আতঙ্কিত। মারধরের পর ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টে বেপরোয়া ওই মদ্যপরা তাঁকে খুনের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে বলে অভিযোগ। সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে আপাতত তাঁর চিকিৎসা চলছে। মারধরে প্রতিবাদী শিক্ষকের চোখ, মুখ, ঘাড় ও মাথায় আঘাত লেগেছে বলে জানা গিয়েছে হাসপাতাল সূত্রে। ঘটনার পর বেলঘরিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন আক্রান্ত শিক্ষকের পরিবার। এর পরেই নড়েচড়ে বসে পুলিশ। অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশিও শুরু হয় । ঘটনার পর তদন্তে নেমে পুলিশ নিমতা থেকে মদিরা মুখোপাধ্যায় নামে এক তরুণীকে গ্রেফতার করেছে । পুলিশের দাবি, ধৃত তরুণী মারধরের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সিসিটিভি ফুটেজ দেখেই চিহ্নিত করা হয় তাঁকে ৷ জানা গিয়েছে, কামারহাটি পুরসভার 31 নম্বর ওয়ার্ডের নন্দন নগরের বাসিন্দা নিরুপম। পেশায় তিনি একজন অঙ্কন শিক্ষক ৷ শিক্ষক হওয়ার সুবাদে এলাকায় যথেষ্ট পরিচিত রয়েছে ৷ শনিবার ভোরে স্থানীয় একটি কালীমন্দিরে পুজো দিয়ে বাইকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। তখন তিনি লক্ষ্য করেন রাস্তার পাশে একটি ঝিলপাড়ে কয়েকজন যুবক-যুবতী বসে প্রকাশ্যে মদ্যপান করছেন ৷ তা দেখে বাইক থামিয়ে তিনি এর প্রতিবাদ করেন ৷ মদ্যপদের উদ্দেশ্যে বলেন, “দিনের বেলায় কেন এখানে মদ্যপান করছো তোমরা ?” যা শুনে পাঁচ-ছ’জন যুবক এগিয়ে আসেন তাঁর দিকে ৷ প্রথমে দু-এক কথায় বচসা ৷ এর পরেই শুরু হয় মারধর। তাতে সামিল হয় এক মদ্যপ যুবতীও। যিনি সবথেকে বেশি মারমুখী ছিল বলে অভিযোগ। বেশ কিছুক্ষণ ধরে প্রকাশ্যে এভাবে চলতে থাকে মদ্যপদের ‘গুন্ডামি’ ৷ স্থানীয় এক মহিলা মারধরের প্রতিবাদ করতে এলে তাঁকেও শাসানি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে, এলাকার লোকজন ছুটে এসে প্রাণ বাঁচান ওই শিক্ষকের। তখনই পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে চম্পট দেয় হামলাকারী যুবক-যুবতী। ঘটনা ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে এলাকায়।বিষয়টি নিয়ে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দ্রবদন ঝাঁ বলেন, “বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে ৷ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে ৷ মারধরে যুক্ত এক তরুণীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে ৷ আশা করছি, বাকিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকেই রেয়াত করা হবে না।” এই বিষয়ে আক্রান্ত শিক্ষক নিরুপম পাল বলেন, “এদিন ভোর ছ’টা নাগাদ বাড়ি ফিরছিলাম। তখন দেখি, 8-9 জন বহিরাগত যুবক ঝিলপাড়ে বসে প্রকাশ্যে মদ্যপান করছে। তার মধ্যে একজন মহিলাও ছিল। মদ্যপান করতে বারণ করেছি সেটাই অপরাধ। গালিগালাজ তো দিয়েছেই, সেই সঙ্গে বেধড়ক মারধরও করা হয়েছে। আগামী প্রজন্ম কী শিক্ষা নেবে, আমি একজন শিক্ষক হয়ে মার খেলাম। ভীষণ আতঙ্কিত আমি। আবারও যে ওদের হাতে আক্রান্ত হব না, তার কী কোনও নিশ্চয়তা আছে ? কারণ, ওরা এখনও বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।”

