রাজ্যে পালাবদলের পর বসতে চলেছে বিধানসভার অধিবেশন। আগামী ১৮ জুন, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকাল 11টায় রাজ্যপালের ভাষণের মধ্য দিয়ে অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে ৷ বিরোধী দল এবং বিরোধী দলনেতা নিয়ে তৃণমূলে ভাঙন সহ একাধিক বিষয় বিষয় নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিধানসভা চত্বর বেশ সরগরম। এরই মধ্যে বিজেপি সরকারের প্রথম অধিবেশন এবং বাজেট নিয়ে সব মহলের নজর এখন বিধানসভার অলিন্দে । বাজেট অধিবেশন যাতে সংসদীয় রীতিনীতি মেনে এবং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার বিধানসভায় অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় বৈঠক এবং কার্য উপদেষ্টা কমিটি বা বিজনেস অ্যাডভাইসরি (বিএ) কমিটির বিশেষ বৈঠক ৷ রাজ্যের শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশাপাশি মঙ্গলবারের সর্বদল বৈঠকে বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মত ৷ এদিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সিপিএমের বিধায়ক মুস্তাফিজুর রহমান রানা এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী ।এদিকে বাজেট অধিবেশনের ঠিক আগে তৃণমূল শিবির যে আরও চাপে, সর্বদলীয় বৈঠকে তা আরও একবার প্রকট হয়ে গেল। আজ এই বৈঠকে ডাক পেলেন না তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় অথবা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ ।এদিনের কার্য উপদেষ্টা কমিটির দীর্ঘ বৈঠকে শাসক ও বিরোধীদের যৌথ সম্মতিতে অধিবেশনের একটি বিস্তারিত খসড়া রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে ৷ সেখানে সর্বসম্মতভাবে স্থির হয়েছে যে, আপাতত আগামী ২৫ জুন পর্যন্ত এই পর্বের অধিবেশন চলবে ৷ এই অধিবেশনে বিরোধীরা ঠিক কী রণকৌশল গ্রহণ করবে এবং শাসকদল কীভাবে তার মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে বঙ্গ রাজনীতিতে এখন জোর জল্পনা ৷মঙ্গলবারের বৈঠকের পর বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, অধিবেশনে তাঁরা সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন ৷ নিজেদের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে তিনি বলেন, “রাজ্যের বর্তমান বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়া সরকারের এই প্রথম বিধানসভা অধিবেশন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। নতুন সরকারের কাছে রাজ্যের সাধারণ মানুষের অনেক না-পাওয়া এবং অনেক প্রত্যাশা জড়িয়ে রয়েছে। আমরা বিধানসভায় একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল, তীক্ষ্ণ এবং গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। তবে যদি দেখি জনস্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনও বিল, নীতি বা প্রস্তাব সরকার পক্ষে আনা হচ্ছে, তবে আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করতে এক পা-ও পিছপা হব না।” একই সুরে সিপিএম বিধায়ক হিসেবে অধিবেশনে উপস্থিত থাকা মুস্তাফিজুর রহমানও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন। নয়া সরকারের কাছে প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে তাঁর বক্তব্য, “দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, যুবক ও শ্রমিকদের যে জ্বলন্ত সমস্যাগুলো জমে রয়েছে, নতুন সরকার তার সমাধানে বাস্তবে কী দিশা দেখায়, সেটাই এখন আমাদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। আমরা এবারের অধিবেশনে সাধারণ মানুষের রুটিরুজির প্রকৃত দাবিগুলোকে জোরালো ভাষায় তুলে ধরব।”

অন্যদিকে, বিধানসভার অন্দরে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীও যে চুপ করে বসে থাকবেন না, তা তিনি এদিন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, “রাজ্যের সংখ্যালঘু, দরিদ্র এবং প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের সার্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলি যাতে নতুন সরকারের নজরে আসে, সেই কারণেই আমি অধিবেশনে আমার এলাকার এবং রাজ্যের সাধারণ মানুষের নির্দিষ্ট অভাব-অভিযোগ ও দাবিগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে উত্থাপন করব।” বিধানসভার কার্য উপদেষ্টা কমিটির চূড়ান্ত করা সূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ভারতীয় সংবিধানের ১৭৬ নম্বর অনুচ্ছেদ মেনে রাজ্যপাল আরএন রবি তাঁর প্রারম্ভিক ভাষণ পাঠ করবেন। এরপর দুপুর সাড়ে 12টা নাগাদ রাজ্যপালের সেই ভাষণের প্রতিলিপি বিধানসভার টেবিলে আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করবেন অধ্যক্ষ স্বয়ং। পাশাপাশি, শাসক দলের কোনও এক প্রবীণ সদস্যের দ্বারা ধন্যবাদজ্ঞাপক প্রস্তাব উত্থাপিত হবে, যা সমর্থন করবেন অপর একজন সদস্য। পরের দিন অর্থাৎ ১৯ জুন, শুক্রবার সকাল ১১ টায় শোকপ্রস্তাব জন্য সময় বরাদ্দ করা হয়েছে ৷তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রথম অধিবেশনের সবচেয়ে বড় এবং আকর্ষণীয় পর্বটি হতে চলেছে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রাজ্য বাজেট পেশ। প্রস্তাবিত সূচি অনুযায়ী আগামী 22 জুন, সোমবার ঠিক বেলা 12টায় বিধানসভার কক্ষে 2026-27 অর্থবর্ষের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি বা রাজ্য বাজেট পেশ করবেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী। নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেটে রাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কী দিশা দেখায়, কর্মসংস্থান ও শিল্পের ক্ষেত্রে কোনও নতুন রূপরেখা থাকে কি না, তা নিয়ে সমাজের সব স্তরেই প্রবল কৌতূহল রয়েছে ৷ ২৩ ও ২৪ জুন অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণের ওপর আলোচনা, মেনশন পর্ব এবং সাধারণ বাজেটের ওপর বিতর্ক চলবে। আগামী ২৫ জুন, বৃহস্পতিবার বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন দফতরের ব্যয়বরাদ্দের দাবি সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলি পেশ হবে। ওই দিনই বিধানসভার কার্যপ্রণালী ও আচরণ বিধির 208-A ধারা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার প্রস্তাবও শাসকদলের তরফে আনা হতে পারে। 25 তারিখের পর অধিবেশনে সাময়িক বিরতি এবং আগামী 6 জুলাই সকাল 11টায় ফের বিধানসভা মিলিত হবে। সব মিলিয়ে আগামী কয়েকদিন বিধানসভা যে রীতিমতো সরগরম থাকতে চলেছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।