রাজ্যপালের ভাষণের মাধ্যমে শুরু হল ১৮তম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অধিবেশন ৷ বৃহস্পতিবার রাজ্যে বিজেপি সরকারের প্রথম বিধানসভার অধিবেশনেই পূর্ববর্তী সরকারকে তীব্র কটাক্ষে বিঁধলেন রাজ্যপাল আরএন রবি ৷ ভাষণের শুরুতেই রাজ্যপাল জানান, রাজ্যে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রশ্রয় পাওয়া সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে ৷ পাশাপাশি তিনি জোর দিয়ে বলেন, “অবৈধ বিদেশি, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর জন্যও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে ৷” মে মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর নবগঠিত বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে প্রথা অনুযায়ী ভাষণ দেওয়ার সময় রাজ্যপাল রবি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলিও তুলে ধরেন। তিনি ‘হুমকির সংস্কৃতি’, দুর্নীতি-সিন্ডিকেট এবং তোলাবাজির চক্রের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতিও দেন। তিনি বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যারা সুরক্ষা পেত, সেই সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে নতুন সরকার ইতিমধ্যেই কঠোর অভিযান শুরু করেছে ৷” রাজ্যপাল আরও আরও বলেন, “অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।” তিনি জোর দিয়ে জানান, সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ৷ মে মাসে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর নবগঠিত বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণ দেওয়ার সময় শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের অগ্রাধিকারগুলির কথা তুলে ধরেন আরএন রবি ৷ সরকারের প্রাথমিক গুরুত্বের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত নিরাপত্তা, শিল্প এবং জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ রয়েছে বলেও জানান রাজ্যপাল। তিনি বলেন, “নতুন সরকার ইতিমধ্যেই সেইসব সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে যাদের পূর্ববর্তী সরকার সুরক্ষা দিত। অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত ও বহিষ্কারের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে ৷” তিনি জোর দিয়ে জানান যে, সীমান্ত নিরাপত্তা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে ৷ সীমান্তের পরিকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিএসএফ-এর (BSF) হাতে জমি তুলে দেওয়ার রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে রাজ্যপাল বলেন, “এই পদক্ষেপ বাংলার আন্তর্জাতিক সীমানা সুরক্ষিত করতে সহায়তা করবে।” একইসঙ্গে তিনি জানান, সরকার হুমকি-ধমকির সংস্কৃতি ও দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের অবসান ঘটাবে। নারী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের উপর নির্যাতনের বিষয়ে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’, কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে ৷

তিনি সাফ জানান, তোলাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে ৷ অবৈধভাবে বালি ও কয়লা উত্তোলনও বন্ধ করা হবে। রাজ্যপাল বলেন, “রাজ্যের মানুষের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণ অবগত এবং স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল প্রশাসনের মাধ্যমে সেগুলির সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” পশ্চিমবঙ্গকে বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্যে রাজ্যপাল বলেন, “রাজ্যকে শিল্পবান্ধব করে তোলা এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সুযোগ সৃষ্টির উপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ৷” নারী ক্ষমতায়ন ও জনকল্যাণমুখী প্রকল্পগুলিতেও নতুন রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র আওতায় মাসিক 3000 টাকা করে সহায়তা প্রদান শুরু হয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্যে মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধাও কার্যকর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বড় চমক হিসেবে রাজ্যে 469টি নতুন ‘জন ঔষধি কেন্দ্র’ খোলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ বাজারদরের চেয়ে 50 থেকে 80 শতাংশ কম দামে উন্নত মানের জেনেরিক ওষুধ পাবেন। একইসঙ্গে, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের অধীনে দরিদ্র পরিবারগুলিকে বার্ষিক 5 লক্ষ টাকার ক্যাশলেস স্বাস্থ্যবিমা প্রদানের কাজও শুরু হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষানীতি 2020-এর সার্বিক বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা গড়ে তুলতে রাজ্য সরকার স্বীকৃত সমস্ত স্কুল এবং মাদ্রাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা মাথায় রেখে সেখানে একটি আইআইটি (IIT), একটি আইআইএম (IIM) বা সমতুল্য প্রতিষ্ঠান এবং আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বোপরি, উত্তরবঙ্গে সর্বাধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিতে বহুল প্রতীক্ষিত ‘এইমস’ (AIIMS) নির্মাণেও সরকার যে বদ্ধপরিকর, তা স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, গোর্খাল্যান্ড ইস্যুতে সমস্ত পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজ্যে থমকে থাকা 36টি রেল প্রকল্প এবং কলকাতা মেট্রোর কাজে গতি আনতে সরকার প্রয়োজনীয় জমি ও সবরকম সহযোগিতা প্রদান করছে। ভাগীরথী নদীর উপর 1800 কোটি টাকা ব্যয়ে কালনা সেতু নির্মাণের ঘোষণাও করা হয়েছে। অন্যদিকে, তাজপুর বন্দর ও হলদিয়াকে শিল্প হাব হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জট কাটাতে পুরনো ওবিসি তালিকা বাতিল করে নতুন সমীক্ষার মাধ্যমে তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে 100-পয়েন্ট রোস্টার চালু করা হয়েছে। চাকরিপ্রার্থীদের সুবিধার্থে বয়সের ঊর্ধ্বসীমাও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া দেশের পাশাপাশি এ রাজ্যে আগামী 2027 সালের ডিজিটাল আদমসুমারির কাজ এই আগস্ট মাস থেকেই শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। ভাষণের শেষে রাজ্যপাল আশা প্রকাশ করেন যে, সমস্ত বাধা ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ফের দেশের মধ্যে তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে।