রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে শাসক-বিরোধীকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান, অন্যদিকে পূর্বতন সরকারের আমলের আর্থিক দুর্নীতি ও বেনিয়মের ‘শ্বেতপত্র’ প্রকাশের কড়া হুঁশিয়ারি । বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের জবাবি ভাষণে বৃহস্পতিবার এই দুই সুরেই সরব হলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত । বিরোধীদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা: গণতন্ত্রে সমালোচনা থাকবেই, কিন্তু রাজ্যের স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে একসঙ্গে পথ চলার সময় এসেছে । অর্থমন্ত্রীর কথায়, “গঠনমূলক সমালোচনা করুন, কিন্তু বাংলার উন্নয়নের প্রশ্নে সবাইকে একই মঞ্চে দাঁড়াতে হবে । পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত রূপান্তর সম্ভব কেবল যৌথ প্রচেষ্টাতেই ।” তবে ঐক্যের আহ্বানের পাশাপাশি পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগতেও পিছপা হননি তিনি । রাজ্যের প্রায় আট লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝার প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার এক কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে । তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে শুধু ঋণই নয়, বিভিন্ন দফতরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনাও ঘটেছে । সেই কারণেই প্রতিটি সরকারি দফতরে ভারতের নিয়ামক ও মহাহিসাব পরীক্ষক (ক্যাগ)-এর মাধ্যমে নিরীক্ষা করানো হবে । তদন্ত রিপোর্ট হাতে এলেই জনসমক্ষে আনা হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শ্বেতপত্র’ । বাজেট বিতর্কে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী । দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাতের আবহ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বলেন, “কেন্দ্রের টাকা বিদেশের টাকা নয়, সেটাও দেশের মানুষের টাকা । পশ্চিমবঙ্গ ভারতেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ।” তাঁর দাবি, বর্তমান সরকার ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের কাছ থেকে প্রায় 60 হাজার কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে । এই আর্থিক সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন এবং অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীকে ধন্যবাদ জানান তিনি । অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু প্রশাসনিক সংস্কার কার্যকর করতে পারলেই কেন্দ্রীয় অনুদান হিসেবে আরও প্রায় 10 হাজার কোটি টাকা রাজ্যের কোষাগারে আসতে পারে । পাশাপাশি অভিযোগ করেন, পূর্বতন সরকারের সময় রাজনৈতিক কারণে কেন্দ্রের একাধিক প্রকল্পের টাকা রাজ্যে ঢুকতে দেওয়া হয়নি । রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ নিয়েও এ দিন সরব হন তিনি । তাঁর দাবি, পূর্বতন সরকারের দেওয়া মাত্র চার শতাংশ ডিএ কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করেছিল । নতুন সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তনে উদ্যোগী হয়েছে । আগামী মার্চে পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের সময় কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা কাঠামো নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিতও দেন তিনি ।
সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নিয়েও তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী । তাঁর বক্তব্য, আগের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্প ছিল সর্বজনীন, যেখানে আয় বা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে কোনও বাছাই ছিল না । অন্যদিকে বর্তমান সরকারের ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকৃত অর্থে পিছিয়ে পড়া মানুষের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে । শুধু অর্থনীতি নয়, শিক্ষা, নারী সুরক্ষা এবং বিপর্যয় মোকাবিলা নিয়েও একাধিক ঘোষণা করেছেন তিনি । হেমতাবাদে একটি নতুন ডিগ্রি কলেজ এবং কালিয়াগঞ্জে একটি মহিলা কলেজ তৈরির কথা জানানো হয়েছে । সন্দেশখালিতে গড়ে তোলা হবে পৃথক মহিলা থানা । পাশাপাশি রাজ্যের জন্য একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী গঠনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে । 200 সদস্যের এই বাহিনীর একাংশ পাহাড়ে, একাংশ সুন্দরবনে এবং বাকিরা রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন থাকবেন । আরজি কর হাসপাতালের মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন এক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাই, যাতে বাংলায় আর কোনও আরজি করের মতো ঘটনা না ঘটে ।” আগামী আট মাসের উন্নয়ন-রূপরেখা এই বাজেটেই তুলে ধরা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি । দুর্গাপুজোর আগেই স্টার্ট-আপ পলিসি, গ্লোবাল কেপাবিলিটি পলিসি, স্পোর্টস পলিসি, ক্লাউড কিচেন নীতি, চা-পর্যটন নীতি এবং একটি বিশেষ এআই মিশন চালুর কথাও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী । বক্তব্যের শেষে সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “কে হিন্দু, কে মুসলিম- এই বিভেদের রাজনীতি ভুলে যান । সব ভারতীয় নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে । রাজ্যের স্বার্থে আসুন সবাই একসঙ্গে কাজ করি ।”

