বিহারের বাঁকীপুর বিধানসভা উপ নির্বাচনে প্রশান্ত কিশোরের জয়লাভ শুধুই কারও প্রথম নির্বাচনী সাফল্যের উদাহরণ নয়, বরং বিহারের রাজনীতির ভাষায় বলতে গেলে এটা একটা ‘দুর্গ দখল’৷ বিগত প্রায় দুই দশক ধরে, বাঁকীপুর এবং নিতিন নবীন কার্যত অবিচ্ছেদ্য, একই সঙ্গে উচ্চারিত৷ রাজ্যসভার সাংসদ তথা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার আগে তিনি এই কেন্দ্র থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন৷ তাঁর আগে এই আসন থেকে লড়তেন বিহার রাজনীতির আরেক প্রোথিতযশা ব্যক্তিত্ব নিতিন নবীনের বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা৷ এই আসন তাই বিজেপির কাছে কেবলমাত্র একটা বিধানসভা আসন নয়, একটা পারিবারিক ঐতিহ্য, পটনার শহুরে ভোটারদের কেন্দ্রবিন্দু৷ বাবা নবীন কিশোর প্রসাদের মৃত্যুর পরে ২০০৬ সালে নিতিন নবীন প্রথম নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন৷ তৎকালীন পটনা পশ্চিম আসন থেকে উপনির্বাচনে জয়ী হন। আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের পরে তিনি ২০১০, ২০১৫, ২০২০ এবং ২০২৫ সালে একটানা বাঁকীপুরের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিটি নির্বাচনের সঙ্গে আসনটিতে তাঁর প্রভাব ক্রমশ আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে নিতিন নবীন ৯৮,২৯৯ ভোট পেয়ে আরজেডি প্রার্থীকে ৫১,৯৩৬ ভোটে পরাজিত করেন। প্রায় ৩.৮ লক্ষ ভোটার অধ্যুষিত একটি আসনে এটি একটি বেনজির জয়।

সেদিক থেকে দেখলে, বাঁকীপুর সেই বিরল আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম যেখানে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি, নিতিন নবীনের পরিবারের ঐতিহ্য এবং শহুরে উচ্চবর্ণ ও মধ্যবিত্তের ভোট একীভূত হয়ে একক রাজনৈতিক কাঠামোয় মিশে যায়। নিতিন নবীন রাজ্যসভায় যাওয়ায় আশা করা হয়েছিল উপনির্বাচনে সেই ঐতিহ্যের একটি মসৃণ হস্তান্তর ঘটবে। কিন্তু তা হল না।

প্রশান্ত কিশোর কিন্তু এমনি এমনিই বাঁকীপুরকে ভোটের ময়দান হিসাবে বেছে নেননি। ২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর দল জন সুরজ পার্টি একটিও আসন পায়নি৷ শুধু তাই নয়, রাজ্যজুড়ে মাত্র ৩.৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল তারা।

বিহারে বিজেপির বিপর্যয় ৷ যে আসনে গত 35 বছরে হারের মুখ দেখতে হয়নি গেরুয়া শিবিরকে, সেই বাঁকিপুরেই বিধ্বস্ত হতে হল তাদের ৷ ওই আসনের উপ-নির্বাচনে জয়ী হলেন এক সময়ের ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর ৷ এই উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন 25 জন প্রার্থী ৷ জন সুরাজ পার্টি (জেএসপি)-র নেতা প্রশান্ত কিশোর 63 হাজার 203 ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন ৷ দ্বিতীয় স্থানে বিজেপি৷ তাদের প্রার্থী নীরজ কুমার 44 হাজার 250 ভোট পেয়েছেন ৷ অন্যদিকে, বিহারের প্রধান বিরোধী দল আরজেডি-র রেখা কুমারী পেয়েছেন 14 হাজার 85 ভোট ৷

প্রশান্ত কিশোরের মতে, এই উপ-নির্বাচন শুধু একজন বিধায়ককে বেছে নেওয়ার জন্য ছিল না ৷ বরং এই ভোটের মাধ্যমে বিহারের মানুষ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বার্তা দিল যে তাদের রাজ্যে একজন ভালো মানুষকে মুখ্যমন্ত্রী করা হোক ৷ তিনি বলেন, ‘‘জনগণ আপনাদের 202 জন বিধায়ক দিয়েছেন ৷ তাই কোনও অপরাধী কিংবা খারাপ আচরণ করা ব্যক্তি, খারাপ চরিত্র বা ভাবমূর্তির ব্যক্তির হাতে রাজ্যের নেতৃত্ব তুলে দেবেন না । এমন একজন ভালো মানুষকে বেছে নিন, যাতে বিহারে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় এবং এখানকার ছেলেমেয়েদের কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে গিয়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে না-হয় ।’’

প্রশান্ত কিশোর বলেন, ‘‘তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিহারের ভালো নেতৃত্ব পাওয়া এবং রাজ্যের উন্নতি হওয়া প্রয়োজন । 2029 সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে কীভাবে রাজ্যের অবস্থার উন্নতি ঘটানো যায়, এখানকার তরুণ-তরুণীরা কীভাবে কর্মসংস্থান পেতে পারেন এবং কীভাবে পরীযায়ী শ্রমিক হওয়ার (বা কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যাওয়ার) অবসান ঘটানো সম্ভব — প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উচিত সেই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়া ৷’’

বিজেপিকে নিশানা করা ছাড়াও প্রশান্ত কিশোর এদিন তাঁকে জেতানোর জন্য বাঁকিপুরের জনতাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ৷ তাঁর প্রতিশ্রুতি, তিনি বাঁকিপুরের মানুষের উন্নতিতে কঠোর পরিশ্রম করবেন ৷ আর যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁদেরও সমর্থন আদায় করার চেষ্টা করবেন ৷ এই জেএসপি নেতা আরও জানান যে, তিনি বা তাঁর দলের নেতারা বিধায়ক হতে কিংবা ঠিকাদারি ও ইজারা-সংক্রান্ত ব্যবসায় জড়াতে এখানে আসেননি ৷ বরং তাঁরা পাঁচ কেজি খাদ্যশস্য, ধর্ম ও জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট চাওয়ার পরিবর্তে জনগণের প্রকৃত কল্যাণ চান ।

প্রশান্ত কিশোর বরাবরই এই নির্বাচনকে নিজের এবং বিজেপি ও তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন । তিনি উল্লেখ করেন যে, গুজরাতের 25 জন সাংসদ যেমন মোদিকে প্রধানমন্ত্রী করতে সহায়তা করেছেন, তেমনই বিহারের 13 কোটি মানুষও তাঁর ওপর অন্ধ আস্থা রেখেছেন ।

প্রশান্ত কিশোর বলেন, ‘‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি) গুজরাত নিয়ে যতটা চিন্তিত, বিহার নিয়েও তাঁর কিছুটা ভাবা উচিত । রাজ্যের যে এক কোটি মানুষ বাইরে কাজ করছেন, তাঁদের বিষয়েও তাঁর উদ্বেগ থাকা প্রয়োজন । এখান থেকে মানুষের কাজের সন্ধানে অন্যত্র চলে যাওয়া বা পরিযায়ী হওয়া রুখতে তাঁর একটি বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া উচিত, যাতে 10 বা 15 হাজার টাকার জন্য কাউকে গুজরাত, মুম্বই, দিল্লি, কলকাতা, কোয়েম্বাটোর, কর্ণাটক বা তামিলনাড়ুতে যেতে না-হয় । আমরা ঠিক এই উদ্দেশ্যেই এখানে এসেছি এবং আজকের এই জয় সেই লক্ষ্যকেই আরও শক্তিশালী করবে ।’’

সম্রাট চৌধুরি নিয়ে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে পিকে বলেন, ‘‘এটি কোনও ব্যক্তিগত লড়াই নয় । তাঁর (সম্রাটের) আচার-আচরণ, চরিত্র ও ভাবমূর্তি সবার জানা । কোনও অপরাধীকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বা শাসক বানালে রাজ্যের উন্নতি হবে না । রাজ্যের মানুষ বিজেপি ও তার নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন যেন কোনও ভালো ও যোগ্য ব্যক্তিকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয় ।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বিহারের জনগণ বিজেপি নেতৃত্বের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, সম্রাট চৌধুরির পরিবর্তে একজন ভালো মানুষকে মুখ্যমন্ত্রী করা হোক । আপনারা যদি কুশওয়াহা সম্প্রদায় থেকে কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করতে চান, তবে তাতে কোনও আপত্তি নেই ৷ কিন্তু এমন কাউকে আনুন যিনি একজন ভালো মানুষ । যেকোনও পরিস্থিতিতেই বিহারের অগ্রগতি হওয়া প্রয়োজন ।’’

যদিও রাজনৈতিক মহল বলছে, প্রশান্ত কিশোর যতই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরিকে নিশানা করুক ৷ বিজেপির এই হারের দায় একা সম্রাট চৌধুরির নয় ৷ বরং নীতীশ কুমারকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো এবং নিট প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে সাম্প্রতিক ছাত্র বিক্ষোভ, সিজেপি-র আন্দোলনও এই ভোটে প্রভাব ফেলেছে ৷