প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদের পর শেক্সপিয়ার সরণির থানা থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তিনি বলেন, “এক হাজার লোক গিয়েছিল তৃণমূলের বিলবোর্ড খুলতে ৷” ক্যামাক স্ট্রিটের পার্টি অফিসের বিলবোর্ড খোলাকে কেন্দ্র করে কলকাতা পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে শেক্সপিয়ার সরণি থানায় তলব করা হয়েছিল তৃণমূল সাংসদকে ৷ তিনি থানা থেকে বেরতেই সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরেন ৷ অভিষেক বলেন, “ওঁদের যা ক্ষমতা আছে, করুক ৷ ভয় পাচ্ছে, রাজনৈতিকভাবে লড়তে পারছে না ৷ তাই এসব করছে ৷” ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ফায়ার অডিট নিয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ তোলেন তিনি ৷ এই প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, “4 মে ভোটগণনার ফলাফল বেরনোর এক মাসের মধ্যে আলিপুরে জেলা পরিষদের অফিসে হঠাৎ রহস্য়জনকভাবে দু’তলা থেকে ন’তলা পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ল, কারও জানা নেই ৷ তখন ফায়ার অডিট হয়নি ৷ 4 হাজার ইভিএম, 4 হাজার ব্যালট ইউনিট, কন্ট্রোল ইউনিট সব আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেল ৷ তখন ফায়ার অডিট হয়নি ৷” তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে ‘ঘুষখোর’ বলে আক্রমণ করে বলেন, “তখন এই ঘুষখোর শুভেন্দু অধিকারীর টনক নড়ে না ৷ এই বিজেপির টনক নড়ে না ৷” বিজেপি সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে অভিষেক আরও বলেন, “তৃণমূলের সাইনবোর্ড নামাতে হবে ৷ অ্য়াকাউন্ট ফ্রিজ করতে হবে ৷ দলের বিধায়ক, সাংসদদের ভাঙাতে হবে ৷ পার্টি ভাঙতে হবে ৷ মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে হুমকি দিচ্ছেন, চমকাচ্ছেন, ভাবছেন, তিনিই গণতন্ত্রের শেষ কথা বলবেন ৷ কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা কোনও শাসক বলে না ৷ সাধারণ মানুষ বলে ৷”
বিলবোর্ড খোলার ঘটনায় দলের এক কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন করার অভিযোগও করলেন অভিষেক ৷ তিনি বলেন, “যে মামলায় আজ আমায় ডাকা হয়েছে, এই একই মামলায় আমাদের এক কর্মীকে গ্রেফতার করে হেফাজতে তাঁর উপর নির্যাতন করা হয়েছে ৷ গতকাল তিনি আদালতে জামিন পেয়েছেন ৷ এখনও 13 জন জেল হেফাজতে রয়েছেন ৷ কোনও নোটিশ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়েছে ৷ পুরোটাই অবৈধ বিষয় ৷ সাত বছরের সাজার কমে কোনও কগনিজেবল অফেন্সে নোটিশ দিয়ে গ্রেফতার করতে হয় ৷ এভাবে গ্রেফতার করা যায় না ৷” ক্যামাক স্ট্রিটের ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল সাংসদ ৷ সম্প্রতি তারাপীঠ থেকে মির্জা গালিব স্ট্রিট একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারীর সরকারকে দায়ী করেন অভিষেক ৷ তিনি বলেন, “ক্যামাক স্ট্রিটের পার্টি অফিসকে ঘিরে যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, সেই একই তৎপরতা যদি এক মাস আগে বিজেপি সরকার দেখাত, তাহলে তারাপীঠের হোটেল কিংবা মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা এড়ানো সম্ভব হত ৷ এত মানুষের মৃত্যু হত না ৷”
সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে অভিষেক স্পষ্ট করেন, “সেদিন (বিলবোর্ড খোলার দিন) কোনও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেনি ৷ বরং তৃণমূল কর্মীদের সিঁড়ি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ ৷ আমাদের কাছে সেই ভিডিয়ো আছে । ” গত 27 অগস্ট তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের কার্যালয়ে দলের বিলবোর্ড খুলতে হঠাৎ হাজির হন কলকাতা পুরনিগমের আধিকারিকরা ৷ সঙ্গে ছিল পুলিশ বাহিনী ৷ তৃণমূল সাংসদ অভিষেক কেএমসি’র এই নির্দেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ৷ বচসা বাধে দু’পক্ষের ৷ মুহূর্তে সেই বচসা হাতাহাতিতে পরিণত হয় ৷ শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও পুর কর্মীরা ভবনের ভিতরে ঢোকেন এবং অফিসের উপরে লাগানো ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ লেখা বিলবোর্ডটি ছিঁড়ে খুলে ফেলেন ৷ এই ঘটনায় 13 জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ । পরে পার্ক স্ট্রিট এবং শেক্সপিয়র সরণি থানায় মোট তিনটি এফআইআর দায়ের হয় । এফআইআরে বেআইনি জমায়েত, সরকারি কাজে বাধা, সরকারি সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া এবং ভীতি প্রদর্শনের মতো অভিযোগে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারাও যুক্ত করা হয়েছে ৷ এফআইআর-এ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া ডেরেক ও’ব্রায়েন, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় এবং হুমায়ুন কবীর-সহ একাধিক তৃণমূল নেতার নাম রয়েছে ৷ এই ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের প্রবল ধস্তাধস্তি হয় ৷ পুলিশকে আটকাতে গিয়ে পড়ে যান রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন ৷ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি ডেরেককেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে কলকাতা পুলিশ । গত রবিবার সকালে তাঁর প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের বাড়িতে গিয়ে নোটিশ দিয়ে আসে শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ ৷ সোমবার তাঁকে হাজির হতে বলা হয় । কিন্তু হাজিরা এড়িয়ে যান ডেরেক ৷ তাঁকে ফের তলব করা হয়েছে ৷ ঘটনাচক্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একের পর এক এফআইআর দায়ের হয়েছে ৷ পাশাপাশি তাঁকে একাধিক মামলায় তলব করা হচ্ছে ৷

