কেষ্টপুরে প্রাক গণেশ পুজোর সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । আর সেই পুজোর মঞ্চ থেকেই বাংলার অতীত শাসকদলগুলির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন তিনি । রাজ্যে সনাতনীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপর ধারাবাহিকভাবে আঘাত নেমে এসেছে বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী । বামেদের 34 বছর এবং পূর্বতন তৃণমূল সরকারের 15 বছরের শাসনকালকে একযোগে নিশানা করেন তিনি । তাঁর দাবি, ওই দুই আমলেই বাংলার হিন্দু সংস্কৃতিকে অবদমিত করার আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছিল । রবিবার কেষ্টপুরে এই পুজোর উদ্বোধনে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তিন বিধায়ক তরুণজ্যোতি তেওয়ারি, পীযূষ কানোড়িয়া এবং অরিজিৎ বকসি । উপস্থিত ছিলেন স্বামী হিরন্ময়ানন্দ প্রভু-সহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা । সনাতনী প্রথা মেনে কপালে চন্দন ও হাতে তাগা বেঁধে পুজোর সূচনা করেন তাঁরা । প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠান থেকেই এই পুজোর অনুপ্রেরণা মিলেছে বলে জানান শুভেন্দু । বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বাম আমলের প্রসঙ্গ টেনে আনেন । মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘বিগত 49 বছরের মধ্যে, 34 বছর ধর্মকে আফিম বলা কমিউনিস্টরা রাজত্ব করেছেন ৷ আর 15 বছর গ্রেটার বাংলাদেশ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে ।’’ বাম আমলে পুজো মণ্ডপের বাইরের পরিবেশ নিয়ে তিনি কটাক্ষ করেন । তাঁর কথায়, ‘‘সেখানে যে বইগুলো থাকতো, একটাও স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বই পাবেন না, একটাও লোকনাথ নন্দজীর লেখা বই পাবেন না… আপনি বিদেশি কার্ল মার্কসের বই পাবেন, আপনি লেনিনের বই পাবেন, হাজার চেষ্টা করলেও আপনি হনুমান চালিশা, গীতা পাবেন না ৷ সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে, আমরা ধর্ম মানি না ধর্ম আফিম ।’’ পূর্বতন তৃণমূল সরকারকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, গত 15 বছরে বাংলাকে ‘জামাতিকরণ’ করার চেষ্টা হয়েছে । বিগত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম না করে মহরমের জন্য দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন বদলের সমালোচনা করেন তিনি । শুভেন্দু বলেন, ‘‘যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে দু‘বার আমি হারিয়েছি নন্দীগ্রাম আর ভবানীপুরে, তিনি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে পুজোর সমন্বয় মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘এবছর মহরম আছে, তাই এবছর বিজয়া দশমীর দিন কোনও ঠাকুরের নিরঞ্জন হবে না’ ।’’পাশাপাশি রাজ্যের প্রাক্তন এক মন্ত্রীর পুজো প্রসঙ্গেও তিনি তোপ দাগেন । মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সনাতনী পরম্পরায় পিতৃপক্ষে কোনও শুভ কাজ হয় না । কিন্তু ওই নেতার পুজো উদ্বোধন করতে পিতৃপক্ষেই যেতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী । সনাতনী প্রথা মেনেই মাতৃপক্ষে দুর্গাপুজোর সূচনা হওয়া উচিত বলে স্পষ্ট জানান তিনি । মহাষ্টমী তিথিতে সম্পূর্ণ শুচিতা বজায় রাখার বার্তাও দেন । প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতির কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে । ইসকন সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘ওপার বাংলার চিন্ময় প্রভুর চোখের জল গোটা পৃথিবীর সনাতনীদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে । আমি ওই চোখের জল দেখতে দেখতে ভাবছিলাম আমরা যদি সেদিন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা স্বামী প্রণবানন্দের লড়াইয়ের মাধ্যমে ভারতভুক্তি না পেতাম, তাহলে আজকের আমাদের অবস্থাও হয়তো চিন্ময় প্রভুর মতোই হতো ।’’ দেশভাগের যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে নিজের পরিবারের কথাও জানান তিনি । তিনি জানান, শুধুমাত্র হিন্দু পরিচয়ের কারণে তাঁর মাকেও ওপার বাংলার বরিশাল থেকে সব ছেড়ে এক কাপড়ে এপারে পালিয়ে আসতে হয়েছিল । পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি হিন্দুদের ‘হোমল্যান্ড’ বা মাতৃভূমি বলে উল্লেখ করেন শুভেন্দু । তাঁর দাবি, 1947 সালের 20 জুন এই কারণেই বাংলার জন্ম হয়েছিল । বর্তমানে ভাষাগত ও জাতিগত বিভেদ ভুলে সমস্ত সনাতনীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন তিনি । ছট পুজো বা গণেশ পুজোর মতো উৎসব এখন আর নির্দিষ্ট কোনও জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন । বিভেদের রাজনীতি সরিয়ে রাখার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই যে প্রাচীর তোলা হয়েছিল তুমি হিন্দিভাষী, তুমি গুজরাতি, তুমি বাঙালি, তুমি মাড়োয়ারি, এই প্রাচীরটা আমরা ভেঙে দিয়েছি 2026-এ । অ্যাট দ্যা এন্ড অফ দি ডে উই অল আর হিন্দুস্তানি (দিনের শেষে আমরা সবাই ভারতীয়), দেশ আমার, আর আমরা অনেক লড়াই করে বাঙালি হিন্দু হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছি ৷ একে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের ।’’

