banganews.net

জোড়া এনকাউন্টারের আবহেই রাজ্য পুলিশ সদর দফতর ভবানী ভবনে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক সেরে কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আইন নিজের হাতে তুলে নিলে পুলিশ যে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না, তা সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে প্রথমে উত্তর 24 পরগনার গাইঘাটা এবং পরে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ দুই এনকাউন্টারের ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপের পক্ষে সওয়াল করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এনকাউন্টারের কারণ পুলিশ বলে দিয়েছে । পুলিশের উপর আক্রমণ করেছে । পুলিশ পাল্টা আক্রমণ করেছে। পুলিশ নিজেই বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছে । আপনারা (সাংবাদিকরা) জানতে পেরে গিয়েছেন। এতে আমার বেশি মন্তব্য করা ঠিক নয়।” মুর্শিদাবাদের ঘটনায় অভিযুক্ত বিজেপি কর্মী ছিল কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রাজনৈতিক রং দেখতে নারাজ মুখ্যমন্ত্রী। সরাসরি জানিয়ে দেন, অপরাধীর কোনও দলীয় পরিচয় হয় না। শুভেন্দুর সাফ বক্তব্য, “বিজেপি কর্মী বলে বিষয় নয়। আইন হাতে তুলে নিলে যা হয় তাই, আইনের যাঁরা ছিলেন তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পরিস্থিতি অনুযায়ী। পুলিশের কাজ আইন প্রয়োগ করা। কেউ আইন হাতে তুলে নিলে সেখানে পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না।” রাজ্যে আইনের শাসন ফেরাতে পুলিশকে যে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, সে কথা আরও একবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমি প্রথম থেকেই বলেছি, পুলিশকে দুটো বিষয়ে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া আছে। মাদক দ্রব্যের ক্ষেত্রে, আর কন্যা, বোন, দিদি, মা- কারও উপর অত্যাচারের ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাস্থলে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করবে। সেক্ষেত্রে পুলিশমন্ত্রী সবসময় পুলিশের পাশে দাঁড়াবে।” মাদক পাচার ও মাদকের কারবার রুখতেও পুলিশকে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি জানান, আক্রান্ত হলে পুলিশকর্মীদের পাশে তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ দমন নিয়ে বলতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমরা গুন্ডাদের আইনি পদ্ধতিতে বাংলা থেকে শেষ করব। কোনও বেআইনি কাজ করতে আমি বলব না । আমি সংবিধান মেনেই শপথ নিয়েছি।” তিনি স্পষ্ট করে দেন, দেশে যে সব রাজ্যে বিজেপির শাসন রয়েছে, সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত। বাংলায় অপরাধীদের সতর্ক করে তাঁর চরম বার্তা, “এখানে এসব গুন্ডামি চলবে না। শুধরে যাও, না হলে জেলে যাও।” একই সঙ্গে পুলিশ সদর দফতরে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক তরজা এড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। সরকারি আধিকারিকদের সামনে রাজনৈতিক মন্তব্য না-করার নীতি স্মরণ করিয়ে তিনি জানান, এখানে শুধুই প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলার পর্যালোচনা হয়েছে। বিরোধীদের আন্দোলন বা মিছিল প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারের কোনও আপত্তি নেই। তবে নিয়ম ভাঙলে কড়া হাতে তা দমন করা হবে। তাঁর বক্তব্য, ” কী করতে হবে তা বিএনএসের মধ্যে রয়েছে। তার উপর পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। “

গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও তা সুনির্দিষ্ট নিয়মে হওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন। শ্যামবাজার কিংবা রাজাবাজারের উদাহরণ টেনে তাঁর যুক্তি, “শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের আমরা অনুমতি দিই।” তবে সরকার ফেলার হুঁশিয়ারি দিলে তা নির্বাচনেই প্রমাণ করতে হবে বলে বিরোধীদের স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। সোশাল মিডিয়ায় ভুয়ো তথ্য ছড়ানো নিয়েও এদিন চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনায় সরকারি ক্ষয়ক্ষতির বাইরে গিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার ছড়ানো প্রসঙ্গে তিনি জানান, যারা এমন পোস্ট করবে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা ও গ্রেফতারির মতো কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই যারা লাইক, শেয়ার করবে, ভুল তথ্য ছড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে । আরও কড়া ব্যবস্থা নেবে। আমরা পুরো সেল তৈরি করেছি। কারও গঠনমূলক সমালোচনা বা মতামত থাকলে তা সরকার শুনবে, কিন্তু অসত্য ছড়ালে প্রশাসন একচুলও রেয়াত করবে না।” মঙ্গলবার সকাল ও বিকেলে রাজ্য়ের দুই প্রান্তে দুটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে । গাইঘাটায় নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে এনকাউন্টার করা হয় ভোরের দিকে। এই খবর নিয়ে চর্চার মধ্যে দুপুরের দিকে জানা যায় একই ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জেও । এখানে এক বিজেপি কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় মূল অভিযুক্তর প্রাণ যায় পুলিশি এনকাউন্টারে । দুটি এনকাউন্টারের মধ্য়ে বেশ কয়েকটি মিল রয়েছে । দুটি ঘটনাতেই পুলিশ অভিযুক্তকে নিয়ে যাচ্ছিল ঘটনার পুনর্নিমাণ করাতে। দুটি ঘটনাতেই অভিযুক্তরা পুলিশের হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে । পুলিশকে তাক করে গুলি পর্যন্ত ছোড়ে । এরপর পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ । তাতে দুটি ঘটনাতেই প্রাণ যায় মূল অভিযুক্তদের । রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই এই ধরনের প্রথম ঘটনাটি ঘটে বারুইপুরে । সেখানেও ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তর প্রাণ যায় এনকাউন্টারে । এই ধরনের একাধিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য়ের মুখ্য়মন্ত্রীর বিধানসভা বিরোধী দলনেতা থাকার সময় একটি কথা চর্চায় আসছে । সে সময় তিনি বলেছিলেন, “মা-বোনেদের উপর যাঁরা অত্যাচার করবে তাদের সকালে জমা করব । বিকেলে খরচ করব ।” বিরোধী শিবিরের কেউ কেউ বলছেন, শুভেন্দুর বলা কথাকেই সত্য় বলে প্রমাণিত করতে চাইছে পুলিশ । এদিকে গাইঘাটায় ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্তের পুলিশি গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের পদক্ষেপকে প্রকাশ্য সমর্থন করেছেন আরজি করের নির্যাতিতার মা তথা বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ । এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে । তাঁর কথায়, “যারা মহিলাদের সম্মান করতে জানে না, যারা মহিলাদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই ।”