রাজ্য রাজনীতির পালাবদলের আবহে তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। যে দলনেত্রীকে ঘিরে একসময় প্রথম সারির নেতা-মন্ত্রীদের দিনরাতের আবর্ত ছিল, আজ তাঁর থেকেই শতযোজন দূরত্ব তৈরি করে নিচ্ছেন এককালের ছায়াসঙ্গীরা। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে কার্যত ফস্কে গিয়েছে গোটা পরিষদীয় দলের রাশ।

সংখ্যার নিরিখে শাসকদলের ধাক্কাটা অভাবনীয়। লোকসভায় নির্বাচিত 28 জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ইতিমধ্যেই 20 জন ‘এনসিপিআই’ নামক এক আনকোরা নতুন দলের ছাতার তলায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। উদ্দেশ্য, সর্বভারতীয় স্তরে এনডিএ শিবিরকে সরাসরি সমর্থন জোগানো। এহেন চরম টালমাটাল ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার রাজ্য বিধানসভার অন্দরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির (পিএসি) চেয়ারম্যান কে হবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন জল্পনা। আর সেই চর্চার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন সদ্য কলকাতা পুরসভার মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া একসময়ের হেভিওয়েট মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম।

বিধানসভার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, অর্থাৎ পিএসি-র মূল কাজ হল রাজ্য সরকারের যাবতীয় আয়-ব্যয় এবং খরচ-খরচার উপর কড়া নজরদারি চালানো। সরকার কোথায় কত টাকা ব্যয় করছে, তার মধ্যে কোনও গরমিল রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে এই কমিটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রশাসনে স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই দীর্ঘদিনের সংসদীয় রীতি মেনে সাধারণত প্রধান বিরোধী দলের কোনও বিধায়ককেই এই কমিটির শীর্ষ পদে বসানো হয়ে থাকে।

কিন্তু, গত কয়েক বছরে রাজ্য রাজনীতিতে এক অভিনব প্রথা চালু করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। খাতায়-কলমে বিরোধী দলের টিকিটে জয়ী হলেও, দলবদল করে শাসকদলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়া বিধায়কদেরই বিশেষ কৌশলে পিএসি চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নিতেন তৃণমূল নেত্রী। উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুস্পষ্ট— বিরোধী শিবিরের গলার কাঁটা হিসেবে তাদেরই প্রতীকে জয়ী কিন্তু কার্যত শাসকদলের অনুগত কাউকে এই নজরদারির পদে বসিয়ে দেওয়া।

অতীতে বর্ষীয়ান রাজনীতিক মুকুল রায় কিংবা আলিপুরদুয়ারের প্রাক্তন বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলালের ক্ষেত্রে ঠিক এই সমীকরণই দেখেছিল রাজ্যবাসী। দু’জনের ক্ষেত্রেই দলবদলের স্পষ্ট রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও পদপ্রাপ্তি আটকে থাকেনি। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিজেপির তরফে বারবার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের তীব্র অভিযোগ তোলা হলেও তা বিধানসভার অন্দরে ধোপে টেকেনি। সেই সময়ে তৎকালীন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপের সমর্থনে বারবার সাফ জানিয়েছিলেন, “বিধানসভার যাবতীয় সংসদীয় রীতিনীতি ও নিয়মকানুন মেনেই পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছে। এখানে কোনও বেনিয়ম বা রীতির খেলাপ হয়নি।”

​কিন্তু রাজনীতির চাকা যে সর্বদা ঘোরে, তা প্রমাণ করেই আজ সেই একই কৌশল ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে খোদ তৃণমূল নেত্রীর দিকেই। বিধানসভার অলিন্দে কান পাতলেই এখন জোর খবর, মমতার সেই পুরনো ও পরীক্ষিত ‘অস্ত্র’ প্রয়োগ করেই এবার ফিরহাদ হাকিমকে পিএসির চেয়ারম্যান পদে বসানোর নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হচ্ছে। মুখে প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমের সামনে কোনও মন্তব্য না করলেও, ফিরহাদ যে আর তাঁর ‘দিদি’র রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে এক মেরুতে নেই, তা তাঁর সাম্প্রতিক আচরণেই অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কলকাতা পুরসভার মেয়রের মতো লোভনীয় পদ থেকে তাঁর আচমকা ইস্তফা সেই জল্পনাকেই উসকে দিয়েছিল। এরপর গত বৃহস্পতিবার বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণ চলাকালীন এই দূরত্বের বিষয়টি সকলের সামনে আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রথা ভেঙে দেখা যায়, ফিরহাদের বসার আসন নির্দিষ্ট হয়েছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জাভেদ খানদের সঙ্গে একই বেঞ্চে। এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, ফিরহাদ এখন পুরোপুরিভাবে বিধানসভার অন্দরে ‘ঋত-পন্থী’ শিবিরের অন্যতম প্রধান মুখ।এই সমীকরণের প্রেক্ষাপটেই রাজনৈতিক মহলে খবর চাউর হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গত্যাগের চূড়ান্ত ‘পুরস্কার’ হিসেবেই ফিরহাদকে এবার পিএসি চেয়ারম্যানের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে মুকুল রায় বা সুমন কাঞ্জিলালের দলবদলের সমীকরণ এবং বর্তমান ফিরহাদের পরিস্থিতির মধ্যে আইনগত ও গুণগত কিছুটা তফাৎ রয়েছে। ফিরহাদের সঙ্গে গেরুয়া শিবিরের অন্তরালে যোগাযোগ নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্তর কানাঘুষো ও জল্পনা চললেও, খাতায়-কলমে তিনি এখনও তৃণমূলেরই নির্বাচিত বিধায়ক। ফলে টেকনিক্যালি তাঁকে এই পদে বসালে তা শাসকদলের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ঠিক যেমনটা একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করতেন বিরোধীদের অস্বস্তিতে ফেলতে।