সরকারি জমি ভুয়ো নথির সাহায্যে বিক্রিতে অভিযুক্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায় ৷ তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার পুলিশ ৷ সেই মামলায় আগাম জামিনের আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি ৷ বুধবার আদালত তাঁকে মৌখিক রক্ষাকবচ দিয়েছে ৷ শুনানি শেষ না-হওয়া পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না বলে জানিয়েছে আদালত ৷ হাইকোর্টের মৌখিক নির্দেশে যখন স্বস্তি পেলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের আপ্ত সহায়ক, তখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর অস্বস্তি বাড়ল ৷ এদিন বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ তাঁর বাড়িতে যায় ৷ তাঁর জন্য একটি নোটিশ সেখানে রেখে আসেন তদন্তকারীরা ৷ শালবনবিতে সরকারি জমি ভুয়ো নথি বানিয়ে বিক্রির অভিযোগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়কে আপাতত মৌখিক রক্ষাকবচ দিল কলকাতা হাইকোর্ট । বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ বুধবার পুলিশকে মৌখিক ভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি এখন থেকে প্রতিদিন এই মামলার শুনানি করবেন । যতদিন না শুনানি শেষ হচ্ছে, ততদিন সুমিত রায়কে যেন গ্রেফতার না করা হয় । আগামী শুক্রবারের মধ্যে তিনি চেষ্টা করবেন এই মামলায় কিছু লিখিত নির্দেশ দিতে । এদিন রাজ্যের অ্যাডিশনাল অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে জানিয়েছেন, তদন্ত এখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে । ১০ লক্ষ টাকা নগদে দেওয়া হয়েছিল চুক্তির আগেই । দালালের বয়ান থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০০৭ সাল থেকে সরকারি জমি এই ভাবে বিক্রির চক্র শুরু হয়েছিল । সিআইডি-কে এই তদন্ত হস্তান্তর করা হচ্ছে । ২০২০ সালে এসে দালাল মারফত জমি বিক্রি করা হয়েছিল । সুমিত রায়ের কাছে সেই জমি বিক্রির টাকা যেত । আর সুজয় হাজরা ছিলেন সেই টাকা সংগ্রহ করার লোক । পালটা সুমিত রায়ের আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করেন, সুজয় হাজরা সরকারি জমি বিক্রি করেছেন, এটাই মূল অভিযোগ । এবং টাকা ক্যামাক স্ট্রিটের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে আসতো বলে অভিযোগ । তাহলে সুজয় হাজরার সঙ্গে সুমিতের কোনওরকম লেনদেনের অথবা কোনওরকম যোগাযোগের অন্তত ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে হাজির করতে বলা হোক । পাশাপাশি এই অভিযোগ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আইনজীবী ।
সরকারি জমি ভুয়ো নথির সাহায্যে বিক্রির অভিযোগের তদন্ত করছে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানার পুলিশ ৷ সুজয় হাজরাকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ৷ তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক ৷ ইতিমধ্যে সুমিত রায়ের খোঁজে কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতেই মাঝরাতে তল্লাশি চালিয়েছিল পুলিশ ৷ তবে সুমিত রায়ের খোঁজ মেলেনি ৷ যদিও এই মামলায় আগাম জামিনের আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন সুমিত রায় । মঙ্গলবার সেই মামলার শুনানি হয় কলকাতা হাইকোর্টে ৷ রাজ্যের পক্ষে আদালতে জানানো হয়, শালবনিতে যে ৫০ একরের বেশি জমি ভুয়ো নথি বানিয়ে বিক্রি করা হয়েছে ৷ বিএলএলআরও জানিয়েছেন, ওই জমি সরকারি । জমি বিক্রির টাকা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্ত সহায়ক সুমিত রায়ের হাতে এসেছিল । আর্থিক লেনদেন সমস্তই নগদে হতো বলে তদন্তে উঠে এসেছে । আদালতে রাজ্যের তরফে আরও জানানো হয়, এই সমস্ত জমি সন্দেহভাজন ব্যাক্তিদের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে । বিষ্ণু রায়, পল্টু রায়, কমলা রায় – এই রকম ভুয়ো নামে নথি বানানো হয়েছে । তদন্তে দেখা যাচ্ছে এই নামেই কেউ নেই । গ্রামবাসীদের থেকে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা ওই সমস্ত সরকারি জমিতে অস্থায়ী ভাবে বসবাস করছিলেন, তাঁদেরকে জোর পূর্বক সেখান থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে । পুলিশের হেফাজতে থাকা সুজয় হাজরার (মিডলম্যান) থেকে একাধিক নথি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ । বিএলএলআরও-র রাবার স্ট্যাম্প-সহ একাধিক নথি তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছে । যদিও পালটা সুমিত রায়ের পক্ষে আইনজীবী সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়ালে বলেন , ‘‘সুমিতের বিরুদ্ধে কোনও তথ্যপ্রমাণ নেই । একটা দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপার ছাড়া আর প্রমাণ নেই । তিনি তাঁর সমস্ত ব্যাঙ্কের নথি আদালতকে দেখাতে প্রস্তুত ।’’ তার পর এদিন আবার শুনানি হয় ৷ সেই শুনানিতেই মৌখিক রক্ষাকবচ দেয় আদালত ৷ ফলে এই মামলায় আপাতত স্বস্তি মিলেছে সুমিত রায়ের ৷ এখন দেখার মামলার শুনানি শেষে আদালত তাঁর আগাম জামিন মঞ্জুর করে কি না !
সুমিত রায়ের বাড়িতে পুলিশ
শালবনি থানায় দায়ের হওয়া মামলায় আপাতত স্বস্তি পেলেও সুমিত রায়ের অস্বস্তি বৃদ্ধি করল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানায় দায়ের হওয়া একটি অভিযোগ ৷ ওই অভিযোগের তদন্তে এবার কলকাতার নিউ আলিপুরে সুমিত রায়ের বাড়িতে পৌঁছয় পুলিশ । বুধবার বিষ্ণুপুর থানার এক মহিলা পুলিশ আধিকারিকের নেতৃত্বে একটি দল সেখানে যায় ৷ তাঁর খোঁজখবর করে ৷ সেই সময় ওই বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন সুমিত রায়ের মা ৷ তাঁর সঙ্গে কথা বলেন তদন্তকারীরা ৷ পুলিশ সূত্রের দাবি, সুমিত রায় বাড়িতে না থাকায় তাঁর উদ্দেশে একটি নোটিশ রেখে আসা হয়েছে । পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, একটি রিসর্ট বুকিং-কে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ । অভিযোগ, একটি রিসর্ট নির্দিষ্ট নামে বুক করা হলেও পরবর্তীকালে সেই রিসর্টের ভাড়া পরিশোধ করা হয়নি । উলটে রিসর্ট কর্তৃপক্ষকে ভয় দেখিয়ে তোলাবাজির চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে । সেই অভিযোগের তদন্তে সুমিত রায়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য পুলিশের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক জানান, তদন্তে ইতিমধ্যেই এই মামলায় সুমিত রায়ের নাম উঠে এসেছে । সেই কারণেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা । তাঁর বক্তব্য, অভিযোগের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে এবং ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য সুমিত রায়ের সঙ্গে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি । পুলিশের এই পদক্ষেপকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও জোর চর্চা শুরু হয়েছে । তবে তদন্তকারীদের দাবি, অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে । তদন্ত এখনও চলছে । তবে সুমিত রায়ের বাড়িতে পুলিশ আসা এই প্রথম নয় । এর আগেও শালবনি থানার বিশাল পুলিশ আধিকারিক সুমিত রায়ের বাড়িতে এসে তল্লাশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করেন ।

