দশভুজা দুর্গা হঠাৎ একাদশভুজা ! সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার ১১ হাতের ছবি ছাপা ঘিরে সোমবার সকাল থেকেই তুমুল বিতর্ক রাজ্যে । পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে রাজ্য সরকারের সমন্বয় বৈঠকের প্রচারে ব্যবহৃত ওই বিজ্ঞাপন নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি । অনেকেই মনে করেন, ভুল হয়ে থাকলে তা অবিলম্বে সংশোধন করে প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করা উচিত । রাজনৈতিক শিবির অবশ্য আরও কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে । পুজোর সময় বাঙালিকে নিরামিষ খাওয়ার ‘ফতোয়া’ দেওয়ার প্রসঙ্গও এখানে উঠে এসেছে । সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দুর্গা পুজো ঘিরে মূর্তি নির্মাণ থেকে থিম, পুজোর আচার থেকে খাবার- কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, তা নিয়ে একের পর এক বিতর্ক তৈরি হয়েছে । সেই আবহেই এবার বিতর্কের কেন্দ্রে খোদ সরকারি বিজ্ঞাপন । কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পুরনিগম এবং রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকের কথা জানাতে সংবাদপত্রে যে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে, তাতেই দেখা যায় ১১ হাতের দুর্গামূর্তির ছবি। বিতর্কের আবহে বিজ্ঞাপনে ভুল থাকার জন্য এদিন মিলন মেলায় মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমা প্রার্থনা করেন । শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “প্রথমেই আমি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে আজকে একটি ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপন সকালবেলায় বেরিয়েছিল । যাঁরা এই ত্রুটিপূর্ণ বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তাঁদেরকে সতর্ক করা হয়েছে এবং পরবর্তীকালে সরকার এই বিষয়ে যত্নবান থাকবে ৷” কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেই অনুষ্ঠানে দেবী দুর্গার যে ছবিটি ছিল তাতেও অস্ত্রের বিন্যাসে ভুল ছিল ! যা নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ৷ প্রচলিত হিন্দু শাস্ত্র ও বাঙালির সাংস্কৃতিক পরম্পরায় দেবী দুর্গার পরিচিত রূপ ‘দশভুজা’ । যদিও বিভিন্ন শাস্ত্র ও মূর্তিতত্ত্বে দেবীর একাধিক হাতের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু ১১ হাতের দুর্গার প্রচলিত রূপ নেই- এই যুক্তিতেই আপত্তি উঠেছে ।
জুনা আখড়ার জগৎগুরু পরমাত্মানন্দ মহারাজ বলেন, “শাস্ত্রে দেবদেবীর মূর্তি নির্মাণের বিভিন্ন বিধান রয়েছে । কোথাও দুর্গার দশ হাত, কোথাও ১৮ বা তারও বেশি হাতের উল্লেখ পাওয়া যায় । কিন্তু ১১ হাতের দুর্গার উল্লেখ কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই । ” তাঁর বক্তব্য, বিজ্ঞাপনের ছবি তৈরির সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল হয়ে থাকতে পারে । ছাপার আগে হয়তো কারও নজরেও পড়েনি। কিন্তু পুজোর ঠিক আগে সরকারি বিজ্ঞাপনে এমন ভুল হওয়া অনভিপ্রেত । ভুল স্বীকার করে ছবিটি সংশোধন এবং প্রয়োজনে প্রকাশ্যে দুঃখপ্রকাশ করা যেতেই পারে ।
বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে তৃণমূলও । মমতা শিবিরের নেতা কুণাল ঘোষ সোশাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন, যখন পুজোর থিম থেকে প্রতিমার ধরন, বিভিন্ন বিষয়ে একের পর এক আচরণবিধি বা নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হচ্ছে, তখন সরকারি বিজ্ঞাপনেই কীভাবে ‘দশভুজা’ দুর্গা ‘একাদশভুজা’ হয়ে গেলেন ? তাঁর কটাক্ষ, “দশভুজা ২০২৬ সালে একাদশভুজা হয়ে গেলেন কোন শাস্ত্র মতে ?” বিজ্ঞাপনটি সংশোধনের দাবিও তুলেছেন তিনি । তৃণমূলের তরফে আরও অভিযোগ, দুর্গা পুজো বাংলার মানুষের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয় । আবেগ ও সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয় । সেই জায়গায় সরকারি প্রচারেই দেবীর প্রচলিত রূপ বদলে যাওয়া বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলার পরিচয় ।
সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ সরকারি বিজ্ঞাপনের ছবি তুলে ধরে কটাক্ষ করেছেন, দেবতারা অসুর বধের জন্য মা দুর্গাকে ১০ হাতে অস্ত্র দিয়েছিলেন, আর বিজেপি সরকারের তরফে নাকি আরও একটি ‘অতিরিক্ত হাত’ দেওয়া হয়েছে ! তাঁর বক্তব্য, পুজোর সময় বাঙালির খাবারদাবার নিয়েও কেউ বিধিনিষেধ চাপাতে এলে তাঁকে ‘কানের গোড়ায় থাবড়া’ মেরে বাংলা থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই নাকি সেই অতিরিক্ত হাত !
কংগ্রেসের তরফেও একই ভাবে আক্রমণ এসেছে । সুমন রায় চৌধুরীর অভিযোগ, দেবীর ১১ হাতের ছবি ছাপার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি দিয়ে যে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক । তাঁর প্রশ্ন, “ভারতীয় জনতা পার্টি কি মা দুর্গার থেকেও বেশি ক্ষমতাশালী ?”
বিতর্কের আবহ আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, বিজ্ঞাপনটি কোনও বেসরকারি পুজো কমিটি বা রাজনৈতিক দলের প্রচার নয়, এটি রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত পুজো সমন্বয় বৈঠকের প্রচার । ফলে সরকারি বিজ্ঞাপনে প্রতিমার ছবি ব্যবহারের আগে যথাযথভাবে যাচাই হয়েছিল কি না, উঠছে সেই প্রশ্ন । এখন দেখার, বিজ্ঞাপনটিকে নিছক ছাপার ভুল বলে সংশোধন করা হয়, নাকি তা নিয়ে সরকারের তরফে কোনও ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসে ।

