বিধানসভা ভোটের হারের পর থেকে সময় যত এগোচ্ছে, ততই তৃণমূলের বিদ্রোহ বাড়ছে৷ প্রথমে বিধায়করা বিদ্রোহ করেন৷ তার পর সাংসদরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন৷ বিধানসভায় বিদ্রোহীরা তৃণমূল নেতৃত্বের নির্দেশ অমান্য করে নিজেদের মতো পরিষদীয় দলনেতা ও অন্যান্য পরিষদীয় পদাধিকারী বেছে নিয়েছেন৷ অন্যদিকে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ তৃণমূল সাংসদ ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে মিশে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন৷ তবে এই দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই বলেই মঙ্গলবার স্পষ্ট করে দিলেন কাকলি ঘোষদস্তিদার৷
এদিন সংসদভবন চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি৷ সেখানে তিনি জানান, বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে তৃণমূলের সেইসব বিদ্রোহী বিধায়কদের কোনও সম্পর্ক নেই৷ বারাসতের সাংসদ বলেন, ‘‘তাঁদের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। তাঁরা একটি আলাদা গোষ্ঠী৷ তাদের বিষয় ও কর্মসূচি ভিন্ন৷’’
উল্লেখ্য, তৃণমূলের তরফে প্রথমে বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়৷ কিন্তু সেই বৈঠকে সই জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে৷ পরে 58 জন তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেন৷ ঋতব্রতকেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বোস৷
প্রশ্ন উঠেছিল যে তাহলে কি মহারাষ্ট্র মডেলে ঋতব্রতরাই নিজেদের আসল তৃণমূল বলে নির্বাচন কমিশনের কাছে দাবি করবেন? এখন পর্যন্ত এমন কোনও দাবি নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ হয়নি৷ এর মধ্যে বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদরা এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন ওঠে ঋতব্রতরাও কি একই দলে যাবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই এদিন স্পষ্ট করে দিলেন কাকলি ঘোষদস্তিদার৷
অন্যদিকে 2024 সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস 29টি আসনে জিতেছিল৷ বসিরহাটের সাংসদ হাজির নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা হয় 28৷ সেই 28 জনের মধ্যে 20 জন গত রবিবার লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করেন৷ সেখানে তাঁর অধ্যক্ষের কাছে আবেদন করেন, তাঁরা এনসিপিআই-এর সঙ্গে মিশে যেতে চান৷
সেই প্রসঙ্গে এদিন কাকলি ঘোষদস্তিদার জানান, এনসিপিআই তৃণমূলের সমস্ত বিদ্রোহী লোকসভার সাংসদকে দলে নিতে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছি। তারা (এনসিপিআই) আমাদের দলে নিতে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে আমরা এনডিএ-র সঙ্গে মিলে কাজ করব।” এর পর কাকলির সংযোজন, “বর্তমানে আমরা 20 জন (সাংসদ) রয়েছি। এই সংখ্যা বেড়ে 22-এ পৌঁছাতে পারে।”
বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বারাসতের সাংসদ জানান, অন্য কোনও দলে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তাঁরা প্রথমে নিজেদের অবস্থানটা গুছিয়ে নিতে চান। প্রসঙ্গত, রবিবার অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করার পর কাকলি জানিয়েছিলেন যে, অধ্যক্ষের কাছে জমা দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে তৃণমূলের 20 জন সাংসদ স্বাক্ষর করেছেন। তিনি বলেছিলেন, “তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ লোকসভায় বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থার অনুরোধ জানিয়ে অধ্যক্ষকে একটি চিঠি দিয়েছেন। আমরা ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি’-র সঙ্গে মিশে যাব এবং এনডিএ-কে সমর্থন করব।” কাকলি ঘোষদস্তিদার সংসদে স্বরাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য৷ এদিন তিনি ওই কমিটির বৈঠকে অংশ নেন৷ তার পর তিনি তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কদের নিয়ে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করেন৷ পাশাপাশি তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদের পরবর্তী পদক্ষেপ-পরিকল্পনা নিয়েও কথা বলেন৷ পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সমালোচনাও করেন তিনি৷ কাকলির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার গত দশ বছরে রাজ্যে নারী নিরাপত্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি। তিনি আরও বলেন, “আমরা এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করছিলাম যে, এমনকি শিশুদের সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলোও বাংলায় কার্যকর করতে দেওয়া হয়নি। ঠিক এভাবেই, আগের (তৃণমূল) সরকারের আমলে আরও অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়নি৷” একই সঙ্গে তিনি জানান, তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সহায়তায় বাংলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সব প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
কাকলি আরও বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। এনসিআরবি-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। এটি একটি অপরাধও বটে। সুতরাং, বাংলায় এসব ঘটনা ঘটছিল৷ অথচ তারা কেউই এই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ করেনি। তাই আমরা বাংলার মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করছি।”

