পাহাড় ভেঙে নেমে আসা জলের স্রোতে নেপালে বিপর্যয়ের ছবি ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে । মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে 1344 । এখনও নিখোঁজ বা যোগাযোগহীন প্রায় 5 হাজারের বেশি। তাঁদের মধ্যে 275 জন ভারতীয় । শুক্রবার নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষর (NDRRMA) প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই স্পষ্ট হয়েছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কতটা ব্যাপক । 26 অগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি বরফ-পাথরের ধস থেকে বিপুল জলের স্রোত নেমে আসে । উত্তর ও মধ্য নেপালের একের পর এক শহর, জনপদ এবং গ্রাম প্লাবিত হয় । কোথাও রাস্তা নিশ্চিহ্ন, কোথাও সেতু ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা এলাকা । বাড়িঘরের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা । NDRRMA-র প্রাথমিক হিসাব বলছে, এখনও পর্যন্ত 32 হাজার 933 জন এই বিপর্যয়ের সরাসরি শিকার । ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কারণে সমস্যায় পড়েছে সাড়ে ছ’হাজারেরও বেশি পড়ুয়া । চারটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে, আরও তিনটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত । প্রায় 55 কিলোমিটার মোটরযোগ্য রাস্তা, 37টি মোটরযোগ্য সেতু এবং 68টি ঝুলন্ত সেতু সম্পূর্ণ বা বড় ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও তৈরি হয়নি । উদ্ধারকাজও চলছে জোরকদমে । স্থলপথ এবং আকাশপথ মিলিয়ে ইতিমধ্যেই 13 হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে । অভিযানে নেমেছেন নেপালের 21 হাজার 421 জন নিরাপত্তাকর্মী । তাঁদের মধ্যে 9 হাজার 287 জন নেপাল সেনা, 7 হাজার 931 জন নেপাল পুলিশ এবং 4 হাজার 203 জন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য । আকাশপথেও চলছে নজিরবিহীন তৎপরতা । নেপাল সেনার হেলিকপ্টার ইতিমধ্যে 881টি উড়ান চালিয়েছে । কাঠমান্ডু থেকে বেসরকারি সংস্থার হেলিকপ্টারও 129টি উড়ান পরিচালনা করেছে । উদ্ধার হওয়া মানুষের মধ্যে রয়েছেন 303 জন বিদেশি নাগরিক । তবে নিখোঁজের তালিকা এখনও দীর্ঘ । সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় 5 হাজার 53 জনের কোনও খোঁজ নেই । তাঁদের মধ্যে রসুয়ায় 2 হাজার 130 জন, নুওয়াকোটে 2 হাজার 340 জন এবং 583 জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন । প্রশাসনের আশঙ্কা, নিখোঁজের সংখ্যার মধ্যে এমন কিছু মানুষও থাকতে পারেন, যাঁদের দেহ উদ্ধার হয়েছে কিন্তু এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি ।
এই বিপর্যয়ে ভারতের উদ্বেগও বাড়ছে । বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, বন্যাকবলিত এলাকা থেকে এখনও পর্যন্ত 169 জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে । কিন্তু 275 জন ভারতীয় এখনও নিখোঁজ । শুক্রবার আরও তিন ভারতীয়- অভিজিৎ সুরেশ পাওয়ার, দীপিকা অভিজিৎ পাওয়ার এবং তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলে সমর্থ অভিজিৎ পাওয়ার- ত্রিশূলী বাজার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে । তাঁদের বিমানে ভারতে ফেরানোর ব্যবস্থা করছে কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস ।
ভারতীয় নাগরিকদের খোঁজে নেপালের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চালাচ্ছে ভারত । শুধু উদ্ধার নয়, ত্রাণ এবং চিকিৎসা সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে । বৃহস্পতিবার দু’টি ভারতীয় বিমান কাঠমান্ডুতে 21 টন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে । সাতটি উড়ানে এখনও পর্যন্ত ভারতের পাঠানো ত্রাণের পরিমাণ প্রায় 95 টন । উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযানে ভারত মোট 54 জন বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে, এঁদের মধ্যে রয়েছেন 30 জন টানেল-রেসকিউ বিশেষজ্ঞ, 19 জন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ এবং পাঁচ সদস্যের চিকিৎসক দল ।
বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, নেপাল যে ধরনের সাহায্য চাইবে, সেই অনুযায়ী আরও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হবে । তার মধ্যে রয়েছে ফরেন্সিক কিট, ‘বেইলি ব্রিজ’ এবং অন্যান্য উদ্ধার সরঞ্জাম । অন্যদিকে, চিন থেকেও নেপালে পৌঁছেছেন বহু ভারতীয় । বিদেশ মন্ত্রকের হিসাবে, 1907 জন ভারতীয় নিরাপদে চিনের দিক থেকে নেপালে প্রবেশ করেছেন । চিনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে দিল্লি জানিয়েছে, তিব্বত স্বশাসিত অঞ্চলে আর কোনও ভারতীয় পর্যটক আটকে নেই ।
এই বিপর্যয়ে আন্তর্জাতিক সাহায্যও পৌঁছতে শুরু করেছে । আমেরিকার সেনাবাহিনীও মানবিক ত্রাণ অভিযানে যোগ দিয়েছে । জরুরি জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী ও উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার কাজে তারা নেপালকে সাহায্য করছে । আমেরিকা ইতিমধ্যেই 5 লক্ষ ডলার এবং আরও 36 লক্ষ ডলার মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছে । অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, চিন, বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং রাষ্ট্রপুঞ্জও নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ।

