বেঙ্গালুরু যাওয়ার ট্রেনের টিকিট নেই । স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন বছর কুড়ির তরুণী । সঙ্গে থাকা দুই আত্মীয় তখন গিয়েছেন কনফার্ম টিকিটের খোঁজে । প্ল্যাটফর্মে একা তরুণীকে দেখে এগিয়ে এলেন রেলেরই এক কর্মী । অভিযোগ, কনফার্ম টিকিট করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় প্ল্যাটফর্মের কাছের একটি ঘরে । তার পর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ৷ ফের একই চেষ্টা হলে কোনও মতে পালিয়ে এসে আত্মীয়দের সব কথা জানান তরুণী। অভিযোগ পেয়েই অভিযুক্ত রেলকর্মীকে গ্রেফতার করল রাউরকেল্লা জিআরপি । অভিযুক্তের নাম কপিলেশ্বর সিংহ (54) । তিনি রাউরকেল্লা স্টেশনে রেলের ‘ভালভ ম্যান’ বা ভাল্ভ অপারেটর হিসাবে কাজ করতেন এবং রেল কলোনিতে থাকতেন । বৃহস্পতিবারই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ । পরে আদালতে তোলা হলে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর ।পুলিশ ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, তরুণী নুয়াপাড়া জেলার বাসিন্দা । দুই আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে বেঙ্গালুরু যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর । টিটিলাগড় থেকে হাতিয়া-যশবন্তপুর এক্সপ্রেসে ওঠার কথা থাকলেও ভুল করে অন্য একটি ট্রেনে উঠে পড়েন তাঁরা । পরে হাতিয়ায় পৌঁছে ভুল বুঝতে পারেন । সেখান থেকে আর একটি ট্রেনে রাউরকেল্লার দিকে রওনা দেন তিনজন । বৃহস্পতিবার সকাল 9টা নাগাদ রাউরকেলা স্টেশনে পৌঁছন তাঁরা । বেঙ্গালুরু যাওয়ার জন্য পরবর্তী ট্রেনের টিকিট জোগাড়ের চেষ্টা শুরু হয় । সকাল 11টা নাগাদ দুই আত্মীয় কনফার্ম টিকিটের বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে তরুণী প্ল্যাটফর্মে একাই ছিলেন । সেই সময়েই কপিলেশ্বর তাঁর কাছে যান বলে অভিযোগ । টিকিট রয়েছে কি না জানতে চান । তরুণী কনফার্ম টিকিট নেই জানালে তাঁকে টিকিট পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন অভিযুক্ত । অভিযোগ, এর পর প্ল্যাটফর্ম 1-এর কাছে অফিসার্স রেস্ট হাউসের পাশে থাকা একটি ভালভ বা অপারেটর রুমে তরুণীকে নিয়ে যান কপিলেশ্বর । ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে সেখানে তাঁকে যৌন নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ । ঘটনার কথা কাউকে জানালে বিপদ হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে । এমনকি চুপ থাকার জন্য তাঁকে 2000 টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের দাবি । এর পর ফের তরুণীর উপর যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করেন অভিযুক্ত, অভিযোগ এমনই । সেই সময় কোনও মতে কপিলেশ্বরের হাত থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালান তরুণী । সোজা চলে যান দুই আত্মীয়ের কাছে । কাঁপতে কাঁপতে তাঁদের কাছে গোটা ঘটনা জানান । এর পর আর দেরি করেননি তিন জন । রাউরকেলা স্টেশনেই থাকা জিআরপি থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন । অভিযোগ পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে পুলিশ । স্টেশনে কর্তব্যরত রেলের কর্মীদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হয় । ভালভ অপারেটর হিসাবে কে ওই সময়ে দায়িত্বে ছিলেন, তা জানতে রেলের সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জিআরপি । পরে কপিলেশ্বরকে ডেকে পাঠানো হলে তরুণী তাঁকেই অভিযুক্ত হিসাবে শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে ।
জিআরপির সাব-ইনস্পেক্টর কৈলাস মুন্ডার নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয় । অভিযুক্ত ও তরুণী – দু’জনেরই মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়েছে । মামলাও রুজু করেছে পুলিশ । তদন্তের স্বার্থে ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য, স্টেশনের সংশ্লিষ্ট জায়গা এবং ওই সময়ের গতিবিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা ৷ ঘটনার পর কড়া পদক্ষেপ করেছে রেলও । চক্রধরপুর ডিভিশনের সিনিয়র ডিভিশনাল কমার্শিয়াল ম্যানেজার আদিত্য চৌধুরী জানিয়েছেন, কপিলেশ্বর সিংহকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে । তাঁর পেনশন-সহ অবসরকালীন কোনও সুবিধাও থাকবে না বলে রেলের তরফে জানানো হয়েছে । অন্যদিকে ওই তরুণীকে আপাতত রাউরকেল্লার ওয়ান স্টপ সেন্টারে রাখা হয়েছে । পরবর্তী সময়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তাঁর বয়ান রেকর্ড করা হবে বলে জানা গিয়েছে । ঘটনার পর রাউরকেল্লা স্টেশনের যাত্রী-নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে । দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথের একটি স্টেশনে, যাত্রীদের সাহায্য করার দায়িত্বে থাকা রেলকর্মীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ।

