দেশের নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ ও পর্যালোচনা করতে পারে, কিন্তু কারও নাগরিকত্ব যাচাই ও নির্ধারণের সাংবিধানিক সংস্থা নয় ৷ এই নিয়ে আইনে কোনও ধোঁয়াশা নেই ৷ শুক্রবার এসআইআর সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলায় এই মন্তব্য করে সুপ্রিমকোর্ট ৷ এদিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি, বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানি চলছিল ৷ আবেদনকারী প্রসেনজিৎ বসু পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের এসআইআর কমিটির চেয়ারপার্সন ৷ তিনি দেশের শীর্ষ আদালতের কাছে আবেদনে জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বিধানসভা আসনে বাদ যাওয়া ভোটারদের দাবিদাওয়া এবং আপত্তির তথ্য প্রকাশ করুক ৷ এদিন এই মামলায় দেশের নির্বাচন কমিশন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং রাজ্যের নির্বাচনী কমিশনের থেকে জবাব চেয়েছে আদালত ৷ মামলাকারী প্রসেনজিৎ বসুর আইনজীবী নেহা রথী এসআইআর-এর এই বিস্তারিত তথ্যের সঙ্গে সঙ্গে কতগুলি 6 নম্বর ও 7 নম্বর ফর্ম জমা পড়েছে, গৃহীত হয়েছে এবং বাতিল হয়েছে, সেই সংখ্যা প্রকাশের আবেদন জানিয়েছেন ৷ এছাড়া, অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে কতগুলি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতগুলি বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে, সেই তথ্যও জানতে চেয়ে আবেদন করেছেন ৷
মামলাকারী প্রসেনজিৎ বসুর তরফে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করানারায়ণ আদালতে জানান, ভোটার তালিকায় বাদ পড়া নামের দাবিদাওয়ার নিষ্পত্তি করতে 18টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে ৷ বাস্তবে এই ট্রাইব্যুনালগুলির কাজে সামঞ্জস্য থাকছে না এবং দেরি হচ্ছে ৷ এদিকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ফলে ভুক্তভোগীরা অন্নপূর্ণা প্রকল্প, রেশনের মতো জনগণের উন্নয়নমূলক প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ৷ এমনকী জাতিগত শংসাপত্রও দেওয়া হচ্ছে না তাঁদের ৷ তখন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বিহার এসআইআর-এর সময় দেওয়া রায়ের কথা উল্লেখ করে বলে, “ট্রাইব্যুনাল যখন বলছে, কোনও ব্যক্তির নাম এসআইআর তালিকায় থাকবে না, তখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব যে তারা ওই ব্যক্তির বিষয়টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রককে জানাবে ৷ মন্ত্রক নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ওই ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাই করে দেখবে ৷”
প্রবীণ আইনজীবী জানান, 33.5 লক্ষ আবেদনকারীর আবেদন এখনও বিচারাধীন ৷ পাশাপাশি নিষ্পত্তি হওয়া তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে যে, 70 শতাংশ আবেদনকারীর দাবিই গৃহীত হয়েছে ৷ এদিকে এর মধ্যে তাঁদের নাম বিভিন্ন সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প থেকে বাদ গিয়েছে ৷ আগামী 25 অগস্ট প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলা-সহ আরও একগুচ্ছ মামলার শুনানি করবে সুপ্রিম কোর্ট ৷ নতুন করে দায়ের হওয়া এই আবেদনে সংবিধানের 14, 19 ও 21 নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে অধিকারসমূহ কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে ৷ এতে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর (SIR)-এর আওতায় তথ্য সংগ্রহের পর্যায়ে 58 লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল ৷ পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, দাবি ও আপত্তি দাখিলের পর্যায়ে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য 9.64 লক্ষ (ফর্ম 6 ও 6A) এবং নাম বাদ দেওয়ার জন্য 99 হাজারেরও বেশি (ফর্ম 7) আবেদন জমা পড়লেও, 28 ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় শেষ পর্যন্ত মাত্র 1.82 লক্ষ নতুন নাম যুক্ত হয়েছে ৷
আবেদনকারী জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী এলাকা-ভিত্তিক এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি যা থেকে বোঝা যায় কতগুলি আবেদন জমা পড়েছে, গৃহীত হয়েছে বা বাতিল করা হয়েছে ৷ এর ফলে এই পুরো প্রক্রিয়ায় কী হয়েছে তা জনগণের কাছে পরিষ্কার নয় ৷ জনস্বার্থ মামলায় বলা হয়েছে, বিস্তারিত তথ্যের অভাব এবং নির্বাচন কমিশনের ‘ম্যানুয়াল অন ইলেক্টোরাল রোলস, 2024’-এ নির্ধারিত ফর্ম বা ফরম্যাটগুলি প্রকাশ না-করার ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে ৷
আবেদনটিতে 60 লক্ষেরও বেশি ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ (logical discrepancy)-র ঘটনা শনাক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে ৷ এতে অভিযোগ করা হয়েছে, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ব্যবধান, একাধিক পারিবারিক সংযোগ এবং নামের অমিলের মতো মানদণ্ডগুলি ‘রিপ্রেজেন্টেশন অফ দ্য পিপল অ্যাক্ট, 1950’ বা এসআইআর সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে কোনও ভিত্তি ছাড়াই চালু করা হয়েছিল ৷ অভিযোগ অনুযায়ী, এই মানদণ্ডগুলির ভিত্তিতেই নোটিশ পাঠানো এবং ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ করা হয়েছে, অথচ এই পদক্ষেপের ভিত্তি সম্পর্কে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি ৷ আবেদনটিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে— আর তা হল এসআইআর (SIR)-এ বাদ পড়া নামের নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত 18টি আপিল ট্রাইব্যুনালের কার্যপদ্ধতি ৷ আবেদনকারীর বক্তব্য, যদিও 7 এপ্রিল একটি তিন সদস্যের বিচার বিভাগীয় কমিটি একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (SOP) বা কার্যপদ্ধতি-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রস্তুত করেছিল, কিন্তু সেই নথিটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি ৷
এই জনস্বার্থ মামলায় এসওপি (SOP) প্রকাশ করার পাশাপাশি বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে আপিল সংক্রান্ত সহজবোধ্য নির্দেশিকা তৈরির নির্দেশ চাওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের— বিশেষত গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে দুর্বল ভোটারদের অংশগ্রহণ ও প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পায় ৷ আবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারদের অনেকেই দরিদ্র, নিরক্ষর অথবা আইনি সহায়তা ছাড়া আপিল প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে অক্ষম; আর পদ্ধতিগত অস্পষ্টতার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ৷

