বুধবার রাত ২টো। মধ্যগ্রামের ভিভা সিটি হাসপাতালের ওয়েটিং লাউঞ্জ যেন এক খণ্ড তপ্ত কুরুক্ষেত্র। শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ পা ছড়িয়ে বসে আছেন চেয়ারে, দৃষ্টি শূন্যে। থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রাজেশ কুমার, রুদ্রনীল ঘোষ, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি থেকে স্বপন দাশগুপ্ত সহ আরও অনেক বিজেপি বিধায়ক। বাইরে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর কড়া প্রহরা। কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী চন্দ্রনাথ রথ আর নেই। ঘটনার সূত্রপাত বুধবার রাত ১০টা নাগাদ। শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শংকর ঘোষ উলটোডাঙ্গা থেকে বিধায়ক হস্টেলের দিকে ফিরছিলেন। শুভেন্দু বেশিরভাগ সময় ব্যাস্ত থাকেন। সেই সময় শংকর শুভেন্দুর সহকারীর সঙ্গে অমিত শাহের কলকাতা সফর এবং শনিবার ব্রিগেডে মোদির উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সূচি নিয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। শংকর বলেন, কথা বলতে বলতে হঠাত চন্দ্রর গলাটা জড়িয়ে যায়। গুলির আওয়াজ শুনতে পাই। আমি ফোনে বেশ কয়েকবার বার ডাকলাম। কিন্তু ও আর সাড়া দিল না। আবার ফোন করলাম ধরল না। টেক্সস্ট ম্যাসেজ করলাম, কীরে ঠিক আছিস তো! কোনও উত্তর না পেয়ে আবার ফোন করতেই ওপাশ থেকে এক অপরিচিত কণ্ঠ ডুকরে উঠে বলে, স্যারকে গুলি করে দিয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে শঙ্কর দ্রুত শুভেন্দু অধিকারীকে টেক্সট করেন। কোলাঘাট পৌঁছে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারী খবরটা পেয়েই স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি দ্রুত শঙ্করকে হাসপাতালে পৌঁছাতে বলে নিজেও মধ্যগ্রামের দিকে রওনা দেন। বৃহস্পতিবার সকালেও শংকরের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে শংকর কান্নায় ভেঙ্গে পডড়েন। ঠিকমত কথা বলতে পারছিলেন না। বুধবার রাতে বিধানসভার সরকারি গাড়িতেই মধ্যগ্রামের ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ। পথে মোটরবাইকে এসে আততায়ীরা তাঁর গাড়ি আটকায় এবং খুব কাছ থেকে বুক লক্ষ্য করে পাঁচ-পাঁচটি গুলি চালায়। চালকের গায়েও তিনটি গুলি লাগে। সেই রক্তাক্ত অবস্থাতেই অসামান্য সাহসিকতায় গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে পৌঁছান চালক। পেছনের সিটে থাকা চন্দ্রনাথের সহযোগী মাথা নিচু করে ফেলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যখন নিথর দেহ থেকে ৯ এমএম পিস্তলের গুলি বের করা হচ্ছে, তখন বাইরে ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তাকে সামনে পেয়ে বিধ্বস্ত শুভেন্দু অধিকারীর গলায় ঝরে পড়ে তীব্র ক্ষোভ— “এদের একজনও যেন পার না পায়!” ডিজি স্বীকার করে নেন, এটি অত্যন্ত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আততায়ীরা রেইকি করে গাড়ি নম্বর ও রাস্তা চিনে তবেই হামলা চালিয়েছে। চণ্ডীপুরের ভূমিপুত্র চন্দ্রনাথ ছিলেন শুভেন্দুর লড়াইয়ের অন্যতম সেনাপতি। তাঁর এই আকস্মিক প্রয়াণে ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা গেরুয়া শিবির। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাকি শুভেন্দুকে বার্তা দেওয়া— এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মধ্যগ্রামের বাতাসে। তবে চোয়াল শক্ত করে শুভেন্দু অনুগামীদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, কাউকেই ছেড়ে দেওয়া হবে না।

