বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্য পুলিশের পরবর্তী ডিরেক্টর জেনারেল বা ডিজি নিয়োগ নিয়ে এক নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে । ডিজি পদে নিয়োগের জন্য রাজ্য সরকার যে তালিকা বা প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি)। 31 ডিসেম্বর 2025 তারিখে ইউপিএসসি-র এআইএস শাখার ডিরেক্টর নন্দ কিশোর কুমার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক বিলম্ব করা হয়েছে, যা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকার পরিপন্থী । এই অবস্থায়, ইউপিএসসি সরাসরি রাজ্যের প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়েছে এবং রাজ্যকে আইনি জট কাটাতে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে । এই সংঘাতের মূলে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ‘প্রকাশ সিং’ মামলার ঐতিহাসিক রায় এবং রাজ্য সরকারের দীর্ঘসূত্রতা । ইউপিএসসি-র চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ প্রধান বা ডিজি (হেড অফ পুলিশ ফোর্স) পদটি গত 28 ডিসেম্বর, 2023 সালেই শূন্য হয়েছিল বলে ধরা হয় । সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, বর্তমান ডিজির অবসরের অন্তত তিন মাস আগেই রাজ্য সরকারকে পরবর্তী ডিজির নামের প্রস্তাব ইউপিএসসি-র কাছে পাঠাতে হয় । চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের সেই রায়ের অংশ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “(ক) সমস্ত রাজ্যকে তাদের শূন্যপদের কথা মাথায় রেখে, বর্তমান ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশের অবসরের তারিখের অন্তত তিন মাস আগে ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠাতে হবে৷ ” অর্থাৎ, নিয়ম মেনে রাজ্য সরকারের উচিত ছিল 2023 সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই এই প্রস্তাব পাঠানো । কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, রাজ্য সরকার সেই সময়সীমা মানেনি । চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইউপিএসসি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় বছর পর, 2025 সালের জুলাই মাসে রাজ্য সরকার ডিজির প্যানেল তৈরির প্রস্তাব জমা দেয় । এই দীর্ঘ বিলম্ব সত্ত্বেও কমিশন গত 30 অক্টোবর, 2025 তারিখে এমপ্যানেলমেন্ট কমিটির বৈঠক ডেকেছিল । কিন্তু দেরিতে প্রস্তাব পাঠানোর কারণে শূন্যপদের সঠিক তারিখ নির্ধারণ এবং আইনি বৈধতা নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয় । এই জটিল পরিস্থিতিতে কমিশন ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেলের (এজি) আইনি পরামর্শ চায় । অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত রাজ্যের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর । ইউপিএসসি-র চিঠিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “…এমপ্যানেলমেন্টের জন্য নাম পাঠাতে রাজ্য সরকারের এই বিলম্ব অত্যধিক। প্রযোজ্য নিয়ম এবং নজিরগুলি পরীক্ষা করে আমি এমন কোনও বিধান খুঁজে পাইনি যা ইউপিএসসি-কে এই অস্বাভাবিক বিলম্ব মার্জনা করার এবং এমনভাবে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা দেয় যেন কোনও অনিয়ম ঘটেনি ।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই প্রস্তাব মেনে নিলে গুরুতর অসঙ্গতি তৈরি হবে, কারণ শূন্যপদের দেরিতে রিপোর্টিংয়ের ফলে যোগ্য প্রার্থীরা এমপ্যানেলমেন্টের বিবেচনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন ।” অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানিয়েছেন যে, রাজ্যের হাতে যখন সমস্যা ছিল, তখন তাদের উচিত ছিল আগেই আদালতের দ্বারস্থ হওয়া । তাঁর ভাষায়, “যে কোনও অসুবিধার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের উচিত ছিল প্রথমেই সুপ্রিম কোর্টে আসা… তাই, সবচেয়ে উপযুক্ত পথ হল রাজ্য সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে অনুমতি বা স্পষ্টীকরণের নির্দেশ চাইতে বলা ৷”