এদিকে, রবিবার দুপুরে বাজেট অধিবেশন শেষ হতেই এই বাজেটকে ‘দিশাহীন’ ও ‘ভিত্তিহীন’ বলে তোপ দাগেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ তিনি বলেন, 2021 সালের বিধানসভা নির্বাচনে হারের জ্বালা মেটাতে এবং বাংলা দখল করতে না-পারার আক্রোশে রাজ্যের মানুষকে ভাতে মারার চেষ্টা করছে কেন্দ্র । শুধু মৌখিক অভিযোগেই থেমে থাকেননি ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ তথা লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের দলনেতা ৷ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ প্রমাণ করতে সরাসরি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছেন তিনি । কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের বাজেট ভাষণকে এদিন ‘জনসংযোগকারী দলের লেখা প্রশংসাপত্র’ বা পিআর টিমের রিপোর্ট বলে কটাক্ষ করেন অভিষেক । তাঁর কথায়, দীর্ঘ ৫১০০ সেকেন্ডের বা প্রায় ৮৫ মিনিটের বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী একবারের জন্যও ‘বাংলা’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি । এই ঘটনাকে তিনি বাংলার মানুষের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবেই দেখছেন । অভিষেকের দাবি, এই বাজেট আসলে ‘ফেসলেস, বেসলেস এবং ভিশনলেস’ (মুখহীন, ভিত্তিহীন ও দিশাহীন)। যে বাজেটে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের নামই থাকে না, তাকে দেশের বাজেট না-বলে বিজেপির রাজনৈতিক ইস্তেহার বলাই শ্রেয় বলে মত তাঁর ৷ অভিষেকের মতে, স্কিল ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – বড় বড় বুলি আউড়েই সরকার নিজেদের দায়িত্ব সেরেছে, কিন্তু যুব সমাজের কর্মসংস্থান বা কৃষকদের আয় বৃদ্ধির কোনও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এই বাজেটে নেই ।
অভিষেকের চ্যালেঞ্জ
এদিন অভিষেকের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল কেন্দ্রের প্রতি তাঁর খোলা চ্যালেঞ্জ । 100 দিনের কাজ এবং আবাস যোজনার বকেয়া টাকা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের সংঘাত দীর্ঘদিনের । এদিন সেই ইস্যুতেই কার্যত মোদি সরকারকে শ্বেতপত্র প্রকাশের চ্যালেঞ্জ জানান অভিষেক । তিনি বলেন, “আমি গত পাঁচ বছর ধরে যে কথা বলে আসছি, আজও তাই বলছি । কেন্দ্র সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করে প্রমাণ করুক যে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর ১০০ দিনের কাজে বাংলার একজন জব কার্ড হোল্ডারও সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পেয়েছেন । যদি বিজেপি সরকার এটা প্রমাণ করতে পারে, তবে আমি রাজনীতি থেকে চিরবিদায় নেব ।” একই চ্যালেঞ্জ তিনি আবাস যোজনা এবং গ্রামীণ সড়ক যোজনা নিয়েও দেন । তাঁর দাবি, আবাস যোজনায় কেন্দ্র 60 শতাংশ টাকা বহন করে, কিন্তু গত চার বছরে বাংলার একজন মানুষও সেই টাকা পাননি । গ্রামীণ সড়ক যোজনায় ২০২১-এর পর ১০ পয়সাও বরাদ্দ করা হয়নি । অভিষেকের বার্তা, নির্বাচনে হেরে যাওয়ার কারণেই বিজেপি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে এই ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’ করছে ।
‘পুরনো প্রতিশ্রুতির রিমিক্স’
বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও বাংলাকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তৃণমূল সাংসদ । তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিমহ্যান্সের (NIMHANS) ধাঁচে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির ঘোষণা করেছেন । বেঙ্গালুরুতে এমন প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই রয়েছে । নতুন করে ঝাড়খণ্ড এবং অসমে আরও দুটি তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে, কিন্তু বাংলার নাম সেখানে নেই । অভিষেকের যুক্তি, এর অর্থ হল বাংলার কোনও মানুষের উন্নত মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাঁকে প্রতিবেশী রাজ্য অসম বা ঝাড়খণ্ডে ছুটতে হবে । নিজের রাজ্যে সেই পরিষেবা মিলবে না । এভাবে বাংলার মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হয়রানির শিকার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিষেকের । পাশাপাশি ডানকুনি করিডর নিয়েও কেন্দ্রের সমালোচনা করেন তিনি । তাঁর দাবি, ডানকুনি করিডরের প্রতিশ্রুতি অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল । এই বাজেটে নতুন কিছু না-বলে সেই পুরনো প্রতিশ্রুতিরই পুনরাবৃত্তি বা ‘রিমিক্স’ করা হয়েছে মাত্র । জল জীবন মিশনে আগে ২৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা বলা হলেও, সেই প্রতিশ্রুতিও সরকার রাখেনি বলে অভিযোগ তাঁর ।
‘এখানে গোহারা হারবে’
কেন্দ্রের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে এদিন আগাগোড়াই আক্রমণাত্মক ছিলেন অভিষেক। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায় কথায় বাংলার 10 কোটি মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন, যা রাজ্যের মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত । তাঁর মতে, বিজেপি খুব ভালো করেই জানে যে বাংলায় তাদের পায়ের তলায় মাটি নেই এবং আগামী দিনেও তারা এখানে ‘গোহারা’ হারবে । সেই নিশ্চিত পরাজয় জেনেই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যের বরাদ্দ আটকে রেখেছে । তবে গণতন্ত্রে এই ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতি যে ব্যুমেরাং হতে পারে, সেকথাও মনে করিয়ে দেন তিনি । তাঁর হুঁশিয়ারি, বিজেপি যতই বঞ্চনা করুক বা অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করুক, বাংলার মানুষ আসন্ন নির্বাচনে ব্যালটেই এর যোগ্য জবাব দেবে ।

