মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলি শাসকদলের হয়ে কাজ করছে ৷ রবিবার অভিযোগ তুলে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এখন থেকে তিনি সরাসরি ফেসবুক লাইভের মাধ্যমেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। তাঁর কথায়, “এখন কোনও মিডিয়া মানুষের মিডিয়া নয়, গদি মিডিয়া। তারা সত্যিকে মানুষের কাছে তুলে ধরবে না। কাজেই আমার অস্ত্র আমার ফেসবুক লাইভ।” মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তিনি যে হাল ছাড়ছেন না এবং প্রয়োজনে রাস্তায় নামবেন, রবিবার সেই বার্তাই স্পষ্ট করে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। রাজ্যে পালাবদলের পর এই মুহূর্তে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় তৃণমূল কংগ্রেস। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর থেকেই দলের অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং দলবদলের জল্পনা। এই কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, রবিবার একটি দীর্ঘ ভিডিয়ো বার্তার মাধ্যমে দলের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি রাজ্যের মানুষের উদ্দেশে মুখ খুললেন তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটগণনা পর্ব অর্থাৎ গত 4 মে থেকে আজ, 20 দিন তিনি কেন নীরব ছিলেন? তাঁর ব্যাখ্যা দেওয়ার পাশাপাশি, বর্তমান শাসকদলের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’, ‘ভোট লুট’ এবং ‘ইভিএম কারচুপির’ বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন তিনি। একইসঙ্গে দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং নেতাদের দল ছাড়া প্রসঙ্গেও তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “যারা বেনোজলে ভেসে আসে তাদের বেনোজলে ভেসে যেতে দিন, এতে তৃণমূল কংগ্রেসের কিচ্ছু যায় আসে না।” রবিবার তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ করে মমতা দাবি করেন, রাজ্যে নির্বাচনের নামে আদ্যোপান্ত প্রহসন হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সুপরিকল্পিতভাবে ইভিএম হ্যাক করে এবং বিরোধী এজেন্টদের গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে জোর করে জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এই 20 দিন মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করেছি। শুধু আমি নই, বাংলার মানুষ, তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীরা যারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন… সবাইকে জোর করে পদত্যাগপত্র লিখিয়ে নেওয়া হচ্ছে।” তাঁর সংযোজন, “এত কাউন্টিং রিগিং করা, ইভিএম মেশিন রিগিং করা, আমাদের কাছে স্পেসিফিক খবর আছে সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিশনের অফিস থেকে ডেটা হ্যাকিং করা… খবরগুলো কানে আসছে এক এক করে।” তিনি আরও দাবি করেন যে, প্রায় 150টি আসনে হারার জায়গায় জেতা এবং জেতার জায়গায় হারার মতো ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। তা না-হলে তৃণমূল 220 থেকে 230টি আসন পেত বলে তাঁর দাবি। বর্তমান শাসকদলের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে রাজ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে তৃণমূলের আড়াই হাজারেরও বেশি পার্টি অফিস দখল করে নেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে মমতা বলেন, “মাথায় ফেট্টি পরে ও মোটরবাইক নিয়ে মানুষের ঘর, পার্টি অফিস লুট করছে, মা-বোনেদের আত্মসম্মান লুট করছে।” ক্ষমতায় এসেই বর্তমান সরকার বুলডোজার দিয়ে হকার উচ্ছেদ করছে এবং বিশ্ব বাংলার মতো ব্র্যান্ডের লোগো ভেঙে দিচ্ছে বলেও সরব হয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক সৌজন্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “তৃণমূল ক্ষমতায় এসে লেনিন বা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে হাত দেয়নি।” বর্তমান সরকার মে মাস থেকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, সংখ্যালঘুদের ভাতা-সহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করে দিচ্ছে বলেও এদিন অভিযোগ করেন তিনি। দলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বেশ কিছু নেতার নিষ্ক্রিয়তা বা দলবদল নিয়ে যে জল্পনা চলছে, সেই প্রসঙ্গে কর্মীদের আশ্বস্ত করে মমতা বলেন, “বাংলার মানুষকে আমি হাতজোড় করে বলব প্লিজ ভয় পাবেন না। কিছু মানুষ আসে তাদের রং বদলায় বহুরূপীর মতো। যারা বেনোজলে ভেসে আসে তাদের বেনোজলে ভেসে যেতে দিন… এরা গেলে বরঞ্চ দলের ভালো হবে।” ক্ষমতা হারানোর পর যাঁরা দল ছেড়ে যাচ্ছেন, তাঁদের নিয়ে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব যে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়, তা এদিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন নেত্রী। পাশাপাশি, মিথ্যা মামলায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ফাঁসানো হচ্ছে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি। আগামী দিনে সর্বভারতীয় স্তরে লড়াই জারি রাখার বার্তাও দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জুনের প্রথম সপ্তাহেই ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বর্তমান সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আজ বেঙ্গল কো লুট কিয়া, কাল আপকো ইসকে লিয়ে দিল্লি চলা জায়েগা। কি হাম লোগ উইক নেহি হ্যায়, আজ হাম লোগোকে উপর অত্যাচার চল রাহা হ্যায়।”