পাহাড়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে কড়া অবস্থান নিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার রাজ্য সচিবালয় নবান্নে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)-এর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং উন্নয়নমূলক কাজে গাফিলতির তীব্র সমালোচনা করেন তিনি । একই সঙ্গে পাহাড়ের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ রাজু বিস্তা ৷ বৈঠকে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন জিটিএ’র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সামা পারভিন ৷ এছাড়া দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের জেলাশাসক, ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, মিউনিসিপ্যাল অ্যাফেয়ার্সের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, হোম সেক্রেটারি এবং মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন ৷ চিফ সেক্রেটারির নেতৃত্বে পুরো প্রশাসনিক দল এই বৈঠকে অংশ নেয় ৷ জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দু’বারের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং নবনির্বাচিত তিন বিধায়ক— ভরত ছেত্রী, সোনাম লামা ও নমান রায়। বিশেষ আমন্ত্রিত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনডিএ শরিক বিমল গুরুং ও রোশন গিরি। এদিন বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পাহাড়ের মানুষের নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকার কোনও আপস করবে না। তিনি বলেন, “পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য বর্তমান সরকার দায়বদ্ধ এবং আগামী দিনে প্রশাসনিক নজরদারি আরও কঠোর করা হবে। এদিন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, গত অর্থবর্ষে জিটিএ-র জন্য 180 কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও তারা কোনও ইউটিলাইজেশন রিপোর্ট জমা দেয়নি। চলতি বছরেও 170 কোটি টাকার বাজেটারি প্রভিশন রাখা হলেও বার্ষিক অ্যাকশন প্ল্যান জমা না-দেওয়ায় তারা এক টাকাও নিতে পারেনি। জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় তদন্ত সিবিআই-ই করবে । এ বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে মামলা করেছিল, তা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী ৷ জিটিএ শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে এর আগে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে । অভিযোগ, 400 জনের বেশি শিক্ষককে বেআইনিভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল । শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির মামলায় রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে যে স্থগিতাদেশ চেয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এদিনের বৈঠকে । এর ফলে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সিবিআই তদন্তের পথ প্রশস্ত হবে। 1200 কোটি টাকার অমৃত প্রকল্পে জল সংযোগ ও অন্যান্য সাধারণ দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে । এ বিষয়ে তদন্তের জন্য হোম সেক্রেটারিকে 7 দিনের মধ্যে স্পেশাল ইনকোয়ারি টিম পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মিউনিসিপ্যাল অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারিকেও 7 দিনের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। অভিযুক্ত সংস্থাকে তদন্ত শেষ না-হওয়া পর্যন্ত ব্ল্যাকলিস্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । উত্তরবঙ্গ ও পাহাড়ের বন্ধ চা-বাগানগুলোর শ্রমিকদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, 2021 সালের বাজেটে প্রধানমন্ত্রী যে 1,000 কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এই অঞ্চল । তিনি টি বোর্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যানকে অবিলম্বে অসম সফর করে এই প্রকল্পের গাইডলাইন বুঝে নিতে এবং পাহাড়ের 10 থেকে 12টি বন্ধ চা-বাগানের শ্রমিকদেরও এই প্যাকেজের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন ৷ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আশ্বাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গাইডলাইন মেনে 300 কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব। গতবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত 100টি পরিবারের মধ্যে 90টি পরিবারের জন্য বাড়ি তৈরির উদ্দেশ্যে 3 লক্ষ টাকা করে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে । বাকি 10টি বাড়ি স্থানীয় সাংসদ রাজু বিস্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে সিএসআর তহবিলের মাধ্যমে নির্মাণ করেছেন। এছাড়াও কালিম্পংয়ে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে । জেলাশাসককে জায়গা চিহ্নিত করে দ্রুত ডিপিআর পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পাহাড়ের চারটি পুরসভার মধ্যে দার্জিলিং বাদে বাকি তিনটিতে মহকুমা শাসকদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। তিনি স্থানীয় সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত উন্নয়নমূলক স্কিমগুলো পাঠানোর জন্য জিটিএ প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিয়েছেন। সামনে বর্ষা মরশুমের কথা মাথায় রেখে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে 10 দিনের মধ্যে পাহাড় ভিজিট করে কুইক রেসপন্স টিম তৈরি রাখতে বলা হয়েছে । গত বছরের দুর্যোগের সময় প্রশাসনিক গাফিলতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “পাহাড়ের প্রতি অবহেলা আর সহ্য করা হবে না।” পাহাড়ে প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, বিশেষ টিম গঠনের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ পাহাড়ের প্রশাসনিক কাজকর্ম এবং উন্নয়নমূলক প্রকল্প নিয়ে কড়া অবস্থান আরও স্পষ্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাহাড়ের বিভিন্ন দফতেরর দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং অনিয়মের তদন্তে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, ড্রিংকিং ওয়াটার, রাস্তা, হেলথ সিস্টেম, এডুকেশন, স্ট্রিট লাইট এবং টুরিস্ট অ্যামিনিটিসের মতো প্রাথমিক পরিষেবাগুলোকে গুরুত্ব দিতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দফতরকে সমন্বয় করে অবিলম্বে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । কালিম্পংয়ে মেডিক্যাল কলেজের জন্য জায়গা চিহ্নিত করে দ্রুত ডিপিআর পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিপর্যয় মোকাবিলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগত অক্টোবর মাসের বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তৎকালীন সময়ে প্রশাসনের একাংশের গাফিলতির কারণে পাহাড় অবহেলিত ছিল। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে আগামী 10 দিনের মধ্যে পাহাড় সফর করতে বলা হয়েছে । তিনি এনডিআরএফ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য এজেন্সির সঙ্গে বৈঠক করে একটি ‘কুইক রেসপন্স টিম’ প্রস্তুত রাখবেন।

