সদ্য সমাপ্ত 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে কার্যত ভূমিকম্প । বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাল সইয়ের মারাত্মক অভিযোগ এবং শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দলের অন্দরে নজিরবিহীন বিদ্রোহ রাজ্য রাজনীতিতে এক ডামাডোলের সৃষ্টি করেছে । দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাদের নেতৃত্বে অন্তত 50 জন বিক্ষুব্ধ বিধায়ক ‘আসল তৃণমূল’ গঠনের পথে পা বাড়িয়েছেন বলে খবর । এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলার রাজনীতিতে এখন মহারাষ্ট্রের শিবসেনা বা এনসিপি-র মতো দল ভাঙনের ছায়া ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে । জানা গেছে, তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। সেই নিয়ে দলের মধ্যেই অস্বস্তি বেড়েছে। এবার সেই অস্বস্তি আরও বাড়ালেন তৃণমূলের বিধায়ক জাভেদ খান, শিউলি সাহারা! কলকাতার এমএলএ হস্টেলে ঋতব্রত ও সন্দীপনের সঙ্গে শিউলি সাহাদের বৈঠক হয়েছে বলে খবর! এদিন রাতে সেই জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন শিউলি নিজেই। তিনি বলেছেন, “বিধায়ক বহিষ্কৃত নয়। দল থেকে বহিষ্কৃত।” এমএলএ হস্টেলে তিনি ঘর দেখতে এসেছিলেন, সেই কথা বলে বৈঠকের জল্পনা উসকে রাখলেন। এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক আগামী কাল, মঙ্গলবারই স্পিকারের কাছে চিঠি দিতে পারেন! ঋতব্রতকে দলনেতা করে ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে স্পিকারের কাছে ওই চিঠি যাবে বলে সূত্রের খবর। রাজনীতির অন্দরের খবর, ঋতব্রত-সন্দীপন বহিষ্কারের পরেই শুরু হয়ে যায় জল মাপা। এদিন বাইপাসের ধারের একটি ঘরে প্রথম বৈঠক হয়, ফের সন্ধেয় নতুন করে এমএলএ হস্টেলের ঘরে বৈঠক হয়েছে! সেই বৈঠকে মালদহ, মুর্শিদাবাদের বিধায়করা-সহ জাভেদ খান, শিউলি সাহা উপস্থিত ছিলেন! সব মিলিয়ে মোট ১৫-১৬ জন বিধায়ক ছিলেন বলে সূত্রের খবর! আগামী দু-একদিনের মধ্যে বিধানসভার স্পিকারকে তাঁরা চিঠি দিতে পরান। সেই কথাও শোনা গিয়েছে। তাহলে কি তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহী বিধায়কদের সংখ্যা আরও বাড়ছে? এদিন এমএলএ হস্টেল থেকে বেরনোর সময় শিউলি বলেন, “হস্টেলে নিজের ঘর দেখতে এসেছিলাম। দেখলাম, ঋতব্রত-সন্দীপনরা বসে। একটু চা খেয়ে গেলাম।” “বিধায়ক বহিষ্কৃত নয়। দল থেকে বহিষ্কৃত।” এই ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যও করেছেন শিউলি।  সই জাল কাণ্ডে ফাঁস তৃণমূলের জালিয়াতি! সেই নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ-রাজনীতি। দল বিরোধী কাজের অভিযোগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ন ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এরপরেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে একের পর এক বোমা ফাটিয়েছেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক। এদিন দুর্নীতি ইস্যুতে তিনি বলেন, “দুর্নীতিতে যা জানি, তদন্ত চাইব। উলুবেড়িয়া পুরসভায় ১০ হাজার ঘর চুরি হয়েছে। টেন্ডার ডাকা হয়নি।” প্রাণের ভয় আছে, সেজন্য সরকারে থাকাকালীন মুখ খুলতে তিনি পারেননি। সেই কথাও এই বিধায়ক বলেন। তিনি আরও বলেছেন, “এগুলো বলতে পারছি, তৃণমূল সরকারে নেই বলে। সরকারকে দুর্নীতির বিষয়ে লিখে জানাব।” তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ৫০ জন বিধায়ক বেরিয়ে যেতে পারেন! দল ভাঙতে পারে! সেই জল্পনাও তুঙ্গে উঠেছে। এরই মধ্যে এদিন রাতে এমএলএ হস্টেলে তৃণমূল বিধায়কদের বৈঠক সেই জল্পনাকে আরও বাড়িয়ে দিল। এমনই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। দলের থেকে দূরত্ব বাড়িয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়ক। সুপ্রিমোর ডাকা বৈঠকেও তাঁরা হাজির হননি। গতকাল, রবিবার সেই বৈঠকও ভেস্তে গিয়েছিল। তাহলে তৃণমূলের ভাঙন কি এখন সময়ের অপেক্ষা? সেই চর্চাও চলছে।

অতীতে তৃণমূল সুপ্রিমো বারবার অভিযোগ করেছিলেন, মহারাষ্ট্রে বিজেপি যেভাবে দল ভাঙিয়েছে, বাংলাতেও সেই চেষ্টা হতে পারে । কিন্তু এখন বহিরাগত শক্তির চেয়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই তৃণমূলের কাছে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে । সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার দরজা আপাতত বন্ধ থাকায়, শিবসেনার একনাথ শিন্ডে কিংবা এনসিপির অজিত পাওয়ারের মতোই বিক্ষুব্ধ নেতারা দলের নাম ও প্রতীক নিজেদের বলে দাবি করে ‘আসল তৃণমূল’ তত্ত্বে শান দিচ্ছেন । সব মিলিয়ে, রাজ্য রাজনীতিতে এখন একটাই প্রশ্ন – মহারাষ্ট্রের ছায়া কি পুরোপুরি গ্রাস করতে চলেছে বাংলার রাজনীতিকে ? আর যদি তা-ই হয়, তবে কালীঘাট বা ক্যামাক স্ট্রিটের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলার রাজনীতিতে কে হবেন সেই একনাথ শিন্ডে ?