সই জাল কাণ্ডে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তাল রাজ্য-রাজনীতি। যার জেরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। এই পরিস্থিতিতে সই জাল কাণ্ডের তদন্তে মঙ্গলবার দুপুরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের বাড়ির সংলগ্ন দলের কার্যালয়ে হানা দিল সিআইডির ৩৫জনের টিম। গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে কলকাতা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তৃণমূলের মূল কার্যালয়ে তল্লাশি চালাতে চান তাঁরা। এবিষয়ে সিআইডি আধিকারিকরা জানান, তাঁরা সই কাণ্ডে একটি নোটিস দিয়েছিলেন। তার জবাবি চিঠিতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তৃণমূলের মূল কার্যালয়ে বিধায়কদের সই সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেই বয়ানের ভিত্তিতে কালীঘাটে তৃণমূলের সেন্ট্রাল পার্টি অফিসে তল্লাশি চালাতে চান আধিকারিকরা। প্রায় এক ঘণ্টার টানাপোড়েন শেষে ভিতরে ঢোকে সিআইডি টিম। মঙ্গলবার দুপুরে ঘড়ির কাঁটায় ৩ টে বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ ৩০ বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট অর্থাৎ তৃণমূলের সেন্ট্রাল পার্টি অফিসে পৌঁছন সিআইডি আধিকারিকরা। মহিলা টিম ঘিরে ফেলেন কার্যালয়ের গেট। ঘটনাস্থলে পৌঁছন কালীঘাট ও ভবানীপুর থানার বিশাল পুলিশ টিম ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। সিআইডির তরফে জানানো হয়, সই জাল কাণ্ডে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ওই কার্যালয়ে তল্লাশি চালাতে চান তাঁরা। তবে এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে। আপাতত কার্যালয়ের দায়িত্বে দলের কোষাধ্যক্ষ তথা রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিষ চক্রবর্তী। তিনি পেশায় আইনজীবী। এদিন দলনেত্রী ও অভিষেক না থাকায় সিআইডির মুখোমুখি হন শুভাশিষ চক্রবর্তীই। সাফ জানান, তিনি তল্লাশির অনুমতি দিতে পারবেন না। এদিকে সামান্য সময়ের ব্যবধানে ক্যামাক স্ট্রিটেও পৌঁছেছে সিআইডির আরেকটি প্রতিনিধি দল। শুভাশিষ চক্রবর্তী বলেন, “আমি আইনজীবী, আপনারা আমাকে জানিয়ে আসেননি। যাঁদের চিঠির ভিত্তিতে এসেছেন তাঁরা এই মুহূর্তে নেই। ওনারা ফিরুন। আপনি ২ দিন পর আসুন।” এরপরই সিআইডির তরফে বলা হয়, “আপনি কাজে বাধা দিচ্ছেন, এর পরিণতি আপনার জানার কথা।” এক পর্যায়ে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে দু’পক্ষ। শেষে শুভাশিষ বলেন, “আমার যা বলার বললাম। আপনারা কী করবেন, আপনাদের ব্যাপার।” এরপর নিরাপত্তারক্ষীরাও চেষ্টা করেন সিআইডি অফিসারদের আটকানোর। গোটা ঘটনার ভিডিওগ্রাফি হয়। পরবর্তীতে কার্যালয়ের বাইরে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেন সিআইডি আধিকারিকরা। এরপরই কার্যালয় ঘিরে ফেলে কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তৃণমূল কার্যালয়ে প্রবেশ করে সিআইডি টিম। সূত্রের খবর, কার্যালয়ের লগবুকের খোঁজেই তল্লাশি চালাতে চালাচ্ছে সিআইডি। উল্লেখ্য, সই কাণ্ডের সূত্রপাত ভোটের ফল ঘোষণার পর। গত ৬ মে বিধায়কদের নিয়ে কালীঘাটে তৃণমূলনেত্রী বৈঠক করেন। তাতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়। ওইদিন যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সকলে হাত তুলে শোভনদেবকে সমর্থন জানান। কিন্তু বিধানসভায় এই সংক্রান্ত যে প্রস্তাবনা জমা দিতে হয়, তা দেয়নি তৃণমূল। এরপর ১৩ ও ১৪ মে বিধানসভায় তৃণমূল বিধায়কদের শপথগ্রহণ হয়। শপথের পর নিয়ম মেনে সই করেন বিধায়করা। বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের কাছ থেকে বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে প্রস্তাবপত্র চান বিধানসভার সচিব। তা জমা দিতে ১৯ মে ফের কালীঘাটের বৈঠক ডাকা হয় বিধায়কদের। ওইদিন কেউ ছিলেন, কেউ ছিলেন না। উপস্থিত সকলের সই নেওয়া হয় দলের তরফে। মিলিয়ে দেখা হয় ক’জন গরহাজির। পরে দলের প্রস্তাবিত বিরোধী দলনেতার নামে সমর্থন জানিয়ে ৭০ জনের সই করা একটি কাগজ জমা দেওয়া হয় বিধানসভায়। তৃণমূলের তরফে জানানো হয়, ওটাই বিরোধী দলনেতার প্রস্তাবনাপত্র। আর এখানেই গরমিল শুরু। দুই জায়গায় তৃণমূল বিধায়কদের সই না মেলায় জালিয়াতি সন্দেহ হয় সচিবের। জল গড়ায় থানায়। দায়ের করা হয় এফআইআর। তদন্তভার পেয়ে কাজ শুরু করে সিআইডি। একাধিক বিধায়ককে জেরা করা হয়। এই ঘটনায় তিনবার দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে তলব করে সিআইডি। যদিও একাধিক অজুহাতে তা এড়িয়ে যান তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। বারবার চিঠি দিয়ে সময় চান। সিআইডির শেষ সমন অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় ডেডলাইন অভিষেকের। শুধু কালীঘাট নয়, একইসঙ্গে একই সময়ে ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসেও হানা দেয় CID-র অন্য এক টিম। উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে দিল্লিতে রয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

