ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এবার পশ্চিমবঙ্গেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগুর পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এই সংক্রান্ত এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নির্বাচনী সংকল্পপত্রকে মর্যাদা দিয়ে রাজ্য সরকার এ রাজ্যেও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করতে সম্পূর্ণ দায়বদ্ধ ৷ আগামী অগস্ট মাসের মধ্যেই এই বিলটি রাজ্যে কার্যকর করার চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ৷ কক্ষের সদস্যদের আশ্বস্ত করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি এই সদনকে আশ্বস্ত করছি যে, এই কমিটিকে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে ৷ অগস্ট মাসে এই কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে আমরা ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল আনব ৷ এই বিল পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর হবে। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, তথ্য দিয়ে আপনারা সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই কমিটির কাছে বক্তব্য রাখতে পারেন।” বিধানসভার দ্বিতীয় অর্ধের শেষলগ্নে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি হয়। তবে সমস্ত বিরোধিতাকে উড়িয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, রাজ্যে একটিই অভিন্ন আইন কার্যকর করা হবে, ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা কোনও আইন চলবে না। এদিন বিধানসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে উঠে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংক্রান্ত বিল নিয়ে নিজের সরকারের রণকৌশল স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিরোধী বেঞ্চের হইহট্টগোলের মধ্যেই তিনি বলেন, “ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল সংক্রান্ত একটি বিবৃতি আমি দিচ্ছি ৷ আপনারা জানেন যে, বিজেপি সংকল্পপত্রে আমরা বলেছিলাম ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল আমরা অনব। আমরা এই বিল আনবই এবিষয়ে কোনও সংশয় নেই। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সব সময় বলে এসেছেন, এক দেশ এক প্রধান এক বিধান এক নিশান। আমরা পশ্চিমবঙ্গেও আমরা UCC বিল ইন্ট্রোডিউস করব।” মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরই কক্ষের অভ্যন্তরে উত্তেজনা ছড়ায়। বিরোধীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা আজকে যে বিবৃতি দিচ্ছি, আপনারা বিচলিত হবেন না, শুনুন, আপনার অবজেকশন দেওয়ার জায়গা আছে ৷ তবে আগে অনুগ্রহ করে শুনুন, এই বিলের বিষয়ে ৷” মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, এই বিলটিকে আইনি রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। আগামী 2 তারিখ রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই বিলের খসড়া অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে। উত্তরাখণ্ড, গুজরাত ও অসমের মতো অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের পথ অনুসরণ করেই বাংলাতেও এই বিল আনা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, “আমরা আগামী 2 তারিখে ক্যাবিনেটে এই বিলের খসড়া অনুমোদনের জন্য আনতে চলেছি ৷ আমরা এই বিলে সোর্স বেস অ্যান্ড রিডিং অ্যাপ্রোচ গুজরাত ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল 2026, দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড অসম 2026, দ্য ইউনিফর্ম সিভিল কোড অফ উত্তরাখন্ড 2024 একে বেস করে আমরা ইউনিফর্ম সিভিল কোড বিল আনতে চলেছি ৷ যেখানে এই রাজ্যে একটা আইন চলবে। ধর্মের ভিত্তিতে দুটো বিল চলবে না।” তবে এই প্রস্তাবিত আইনের আওতা থেকে রাজ্যের আদিবাসী ও প্রাচীন মূলবাসীদের যে ছাড় দেওয়া হচ্ছে, তাও এদিন পরিষ্কার করে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “শুধু এক্ষেত্রে মূলবাসী আদিবাসী এবং কুড়মি-সহ আর যারা আছেন যারা আমাদের প্রাচীন জনজাতি মূলবাসী তারা এই প্রস্তাবিত বিলের আওতার বাইরে থাকবে।” অর্থাৎ, আদিবাসী ও কুড়মি সংস্কৃতির নিজস্ব রীতিনীতি ও সামাজিক প্রথাকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই এই সিদ্ধান্ত বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা ৷ এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি বা টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ তিনি বলেন, “আমি উত্তরাখণ্ড, গুজরাতকে ফলো করে একটি কমিটি গঠন প্রস্তাব আকারে আমরা করেছি। সেই কমিটির মাথায় থাকবেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই চেয়ারপার্সন। এর সঙ্গে মেম্বার থাকবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অফিসার, আইন বিশেষজ্ঞ, একজন শিক্ষাবিদ, একজন সমাজকর্মী এবং একজন এডিশনাল সেক্রেটারি জেনারেল।”
কমিটির কার্যপরিধি ব্যাখ্যা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই টাস্ক ফোর্সের কাজ যেগুলো দেওয়া হয়েছে কন্ডাক্ট এ কমপ্রিহেন্সিভ স্টাডি অফ দ্য ভেরিয়াস পার্সোনাল ফ্যামিলি লজ প্রিভেলিং ইন দ্য স্টেট ইনক্লুডিং প্রভিশনস রিলেটেড টু ম্যারেজ, ডাইভোর্স, মেইনটেন্যান্স, সাকসেশন, অ্যাডপশন অ্যন্ড লিভ ইন রিলেশনশিপ।” এই কমিটিকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও বিধানসভায় জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বক্তব্যের শেষে বিরোধীদের কড়াবার্তা দিয়ে এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন, “কিন্তু শুনে রাখুন উই আর কমিটেড, আমরা সংকল্পপত্রে লিখেছি, ইউসিসি পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর হবে, হবে, হবে।” রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনীতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র আকার ধারণ করতে চলেছে।

