রাজ্যের প্রশাসনিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে সরকারি পরিষেবা, সর্বত্র বাধ্যতামূলক মাতৃভাষা বাংলা । আগামী 1 সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার থেকে রাজ্যের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার আবশ্যিক করা হচ্ছে বলে বিধানসভায় ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দেওয়া একটি চিঠির সূত্র ধরেই রাজ্য সরকার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে । একইসঙ্গে, বিগত সরকারের আমলে তৈরি হওয়া 21 জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্টও জনসমক্ষে আনার কথা জানিয়েছেন তিনি ।অধিবেশনে মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর সাম্প্রতিক তিন দিনের বঙ্গ সফরে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একটি চিঠি দিয়েছেন । ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের 125তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লেখা ওই চিঠিতে সরকারি স্তরে মাতৃভাষার ব্যাপক প্রয়োগের উপর জোর দেওয়া হয়েছে । কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই উপদেশ মেনেই রাজ্য সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করছে । বিধানসভায় এই ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আগামী 1 সেপ্টেম্বর 2026 থেকে পশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরে আমরা বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করলাম ।”
প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছে দিতেই এই সিদ্ধান্ত । জানা গিয়েছে, ভূমি সংস্কার কার্যালয় থেকে শুরু করে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত প্রশাসনের প্রত্যেকটি স্তরে এবার থেকে ফাইল পরিচালনা, দফতরের চিঠিপত্র এবং সরকারি নির্দেশিকায় গুরুত্ব পাবে বাংলা ভাষা । এমনকী পুলিশের কাছে এফআইআর দায়ের করা, অভিযোগ নথিবদ্ধকরণ এবং পোর্টাল বা ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে । এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুবাদক এবং পরিকাঠামো তৈরির কাজও রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেরে ফেলবে ।
তবে শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কাজ নয়, ভিন রাজ্য বা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলার ব্যবহারকে সমানভাবে প্রাধান্য দেওয়া হবে । এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলেন, “ভারত সরকার বা অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে আমরা বাংলা ভাষাতে চিঠিপত্র করব, উত্তর দেব । তার সঙ্গে সঙ্গে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা বাংলা ভাষার পাশাপাশি হিন্দি ভাষাতেও উত্তর বা চিঠিপত্র আদান-প্রদান করব ।”
অর্থাৎ, কেন্দ্রের কাছে পাঠানো চিঠির মূল বয়ান বাংলায় থাকলেও, সুবিধার্থে তার একটি হিন্দি অনুবাদও জুড়ে দেওয়া হবে । এই অনুবাদ প্রক্রিয়ায় ভারত সরকারের তৈরি বহুভাষিক অনুবাদ সফটওয়্যার ‘ভারতী’-র সাহায্য নেওয়া হতে পারে ।
ভাষা সংক্রান্ত এই বড় ঘোষণার দিনই আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী । বিগত সরকারের আমলে গঠিত 21 জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি । প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে 2011 সালে ওই কমিশন গঠন করা হয়েছিল । সেই রিপোর্টের প্রসঙ্গ টেনে এনে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি পূর্বতন সরকারকে নিশানা করেন ।
অধ্যক্ষের কাছে বিকেলে দশ মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বিগত সরকার 2011 সালে আসার পর 21 জুলাই কমিটি করেছিল ৷ রিটায়ার্ড জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্য়ায়ের নেতৃত্বে যা 21 জুলাই কমিশন নামে পরিচিত ছিল । আমি সেই রিপোর্ট আজকে বিকালে জনগণের সামনে প্রকাশ করব ।”
বিরোধী শিবিরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি আরও বলেন, “জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় যা যা রেকমেন্ড করেছিলেন, যারা আগামিকাল 21 জুলাই করবেন, তারা 15 বছর সরকারে থেকে তা কতটা কার্যকর করেছেন আর করেননি, সেটা বিকেলে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমি বাংলার জনগণের সামনে রাখব ।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, একদিকে মাতৃভাষা আবেগকে সম্মান জানানো এবং অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পুরনো 21 জুলাইয়ের রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে বিরোধীদের অস্বস্তিতে ফেলা— বিধানসভার এই অধিবেশনে কার্যত জোড়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাল দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ।

