একুশে জুলাই গুলিচালনা কাণ্ডের তদন্ত রিপোর্ট অবশেষে প্রকাশ করল রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভায় সেই রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে ফের একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যকেই নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ৷ এদিন বিধানসভায় বিচারপতি সুশান্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় কমিশনের ওই রিপোর্ট তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি বলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাকরণ থেকে এই সংক্রান্ত কোনও তথ্য বা নথিই কমিশনকে দেননি ৷ কারণ তাঁর বিদ্যুৎমন্ত্রী ফেঁসে যেতেন ৷ তিনিই আবার আগামিকাল কালীঘাট তৃণমূলের সভায় যাবেন !” এখানেই শেষ নয়, মুখ্যমন্ত্রী জানান, শহিদদের আবেগকে ব্যবহার করে তৃণমূল নেতারা বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। অথচ নিহত ও আহতদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ থেকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। 1993 সালের 21 জুলাই মহাকরণ অভিযানের সময় পুলিশের গুলি চালনার ঘটনায় 2011 সালে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল তৎকালীন সরকার। যদিও সেই কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসেনি ৷ এদিন বিচারপতি সুশান্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কমিশনের সেই রিপোর্ট পেশ করে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী ৷তিনি কমিশনের রিপোর্ট থেকে উল্লেখ করেন, “আইন অনুযায়ী তদন্ত হয়েছে বলে কমিশন মনে করে না ৷ পুলিশের গুলি চালানোর কোনও তথ্যও পাওয়া যায় না ৷ মহাকরণ থেকে ফাইল হারিয়ে যাওয়া নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন বলে কমিশন জানিয়েছে ৷” এরপরই মুখ্যমন্ত্রী কমিশনের রিপোর্টকে সামনে ধরে বলেন, “মহাকরণ থেকে কোনও তথ্য বা নথি কমিশনকে হস্তান্তর করা হয়নি ৷ পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতাও কমিশন পায়নি ৷ যে 12 জন নিহতকে চিহ্নিত করা হয়েছিল তাঁদের পরিবারকে 25 লক্ষ টাকা এবং আহতদের 12 লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করছিল কমিশন ৷” মুখ্যমন্ত্রী এদিন দাবি করেছেন, ক্ষতিপূরণ নিয়ে কমিশনের সেই সুপারিশও মানেনি বিগত সরকার ৷ তাঁর কথায়, “কমিশনের সুপারিশ কী ছিল আর আপনারা কী করেছেন ! নিহতদের 2 লক্ষ আর আহতদের 15 হাজার টাকা দিয়েছেন ! লজ্জা লাগে না আপনাদের ? আহত বা নিহতদের পরিবারকে বলব, আপনারা নতুন করে এফআইআর করতে চাইলে বর্তমান সরকার সেই সুযোগ দেবে ৷ আর আপনারা কমিশনের সুপারিশ মতো ক্ষতিপূরণ চাইলে আমরা মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে সেই টাকাও দেব ৷” এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, বাংলার এগারো কোটি মানুষ এত বছর ধরে প্রকৃত সত্য জানতে পারেননি। বিরোধী দল তৃণমূলকে নিশানা করে তিনি বলেন, “এই দিনটাকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক পদ বা সরকারি ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত বিষয় সম্পত্তি, আমেরিকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসা, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা, হরিশ চ্যাটার্জি, হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৮টা প্লটের মালিক হওয়া, অসংখ্য প্রাসাদের মত বাড়ি তৈরি করা— অনেক অনেক কিছু করে নিয়েছেন।”

মুখ্যমন্ত্রী জানান, মোট 44 জনকে তলব করেছিল ওই কমিশন। সেই তালিকায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষারকান্তি তালুকদার এবং বিমান বসুর মতো বাম নেতাদের পাশাপাশি একাধিক কংগ্রেস ও তৃণমূল নেতার নাম ছিল। তবে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কমিশন ডাকেনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা প্রয়াত পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেছিলেন। পঙ্কজবাবুর বক্তব্য উদ্ধৃত করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, গুলি চালানোর জন্য দায়ী ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত। কিন্তু তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। তাই কমিশন তাঁর নাম নিতে পারেনি।” কমিশনের রিপোর্টের মূল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি জানান, মহাকরণ আক্রমণের কোনও বাস্তব আশঙ্কা সেদিন ছিল না। ধর্মতলা, মেয়ো রোড বা রেড রোডের মতো এলাকায় যে গুলি চলেছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং উস্কানিবিহীন। মহাকরণ থেকে এই সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হয়ে যাওয়া নিয়েও পূর্বতন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে কমিশন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর রিলিফ ফান্ড থেকে আমি সেই ক্ষতিপূরণ দেব। আর যারা আপনাদেরকে ব্যবহার করে এমপি, এমএলএ, মন্ত্রী হলো, চার্টার্ড ফ্লাইটে চললো, তাদের থেকে আপনারা দূরে থাকবেন।” বক্তব্যের শেষে আমফান এবং কোভিড পর্বের দুর্নীতির প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। হুঁশিয়ারি দেন, ক্যাগ রিপোর্ট সহ সমস্ত তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে এবং দরকারে তা জনসমক্ষে আনা হবে। সবশেষে দোষীদের শাস্তির অঙ্গীকার করে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন মুখ্যমন্ত্রী।