রাজ্য বিধানসভায় নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা । বিরোধী দলের মুখ্য সচেতকের বক্তব্যে প্রকাশ্যেই বাধা দিয়ে একদিনের জন্য সাসপেন্ড হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের (কালীঘাটপন্থী) বিধায়ক কুণাল ঘোষ । বিধানসভার অন্দরে তাঁর আচরণকে কেন্দ্র করে বুধবার ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায় । পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে অধ্যক্ষের নির্দেশ অমান্য করায় শেষপর্যন্ত মার্শাল ডেকে তাঁকে কার্যত চ্যাংদোলা করে কক্ষের বাইরে বের করে দেওয়া হয় । গোটা ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী । লিডার অফ দ্য হাউজ হিসেবে তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন । এদিন বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন বক্তব্য রাখছিলেন বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক আখেরুজ্জামান । ঠিক সেই সময় আচমকাই নিজের আসন ছেড়ে সোজা ওয়েলে নেমে আসেন কুণাল ঘোষ । দ্রুত পায়ে এগিয়ে যান আখেরুজ্জামানের মাইকের সামনে । সেখানে গিয়ে রীতিমতো চিৎকার করতে থাকেন তিনি । তাঁর একটাই দাবি, কেন তাঁকে বলতে দেওয়া হল না ? এই নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল বচসা শুরু হয়ে যায় । পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হতে দেখে বিজেপি বিধায়কদের একাংশ কুণালকে আটকাতে এগিয়ে আসেন । ছুটে আসেন বিধানসভার মার্শালরাও । হট্টগোলের জেরে অধ্যক্ষ নিজের আসন থেকে বারবার কুণালকে তাঁর চেয়ারে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন । জানিয়ে দেওয়া হয়, নির্দেশ অমান্য করলে তাঁকে বের করে দেওয়া হবে । কিন্তু অধ্য়ক্ষের সেই অনুরোধ বা হুঁশিয়ারি, কিছুই কানে তোলেননি কালীঘাট শিবিরের এই নেতা । এরপরই বিধানসভার অন্দরে এক বেনজির দৃশ্যের সাক্ষী থাকেন উপস্থিত সদস্যরা । মার্শালরা একপ্রকার বাধ্য হয়েই কুণালকে চ্যাংদোলা করে কক্ষের বাইরে বের করে দেন । এই ঘটনার পর বিধানসভার ভিতরেই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান মুখ্যমন্ত্রী । গোটা ঘটনাটিকে তিনি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যা দেন । মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘‘এইরকম অসভ্যতামি বিধানসভায় আমরা আগে দেখিনি । আমরাও বিরোধী দলে ছিলাম, শাসকদলে আছি । মাননীয় আখেরুজ্জামান সাহেব এই বিধানসভার অনেকদিনের মেম্বার, প্রাক্তন মন্ত্রী । ওঁর বাবা হাবিবুর রহমান সাহেব মুর্শিদাবাদ জেলার আপামর মানুষের একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি । আজকে যেভাবে মমতাপন্থী তৃণমূলের একজন সদস্য তাঁকে কার্যত শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন, আমি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবং লিডার অফ দ্য হাউজ হিসেবে এর তীব্র নিন্দা করছি ।’’ যাঁকে ঘিরে এত কাণ্ড, সেই আখেরুজ্জামানও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন । দলের কোন সদস্যকে বলতে দেওয়া হবে, তা যে সম্পূর্ণ তাঁর এক্তিয়ারভুক্ত, সে কথা মনে করিয়ে দেন তিনি । নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে তিনি বলেন, “একজন অপজিশন চিফ হুইপ হিসেবে দলের কোন সদস্যকে বক্তব্য রাখতে দেব কি দেব না, সেটা আমাদের ব্যাপার । আমাদের দলের 80 জন বিধায়ক আছে, সব বিধায়ককে সবসময় বলতে দেওয়া সম্ভব হয় না । অনেক বিধায়ক বক্তব্য রাখতে চান, আমাকে দল এই দায়িত্ব দিয়েছেন । আমি আমার দলের যাকে ভালো মনে করব, যারা ভালো বলবে, তাদের বলতে দেব, এখানে কারও কিছু বলার নেই । কারণ 80 জনের মধ্যে সবাই বলতে চাইলে 80 জনকে বলতে দেওয়া যায় না, এটা ওঁর জেনে রাখা উচিত ছিল ।” কুণাল ঘোষ কক্ষ থেকে অপসারিত হওয়ার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি ওঠে । রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় জানান, নিজের সুদীর্ঘ পরিষদীয় জীবনে এমন ঘটনা তিনি কখনও দেখেননি । এই আচরণের জন্য কুণালকে চলতি অধিবেশনের শেষ দিন পর্যন্ত সাসপেন্ড করার সুপারিশ করেন শিল্পমন্ত্রী । কিন্তু অধ্যক্ষ এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই আসরে নামেন মুখ্যমন্ত্রী । তিনি জানান, কুণালকে অহেতুক বিখ্যাত করার কোনও প্রয়োজন নেই । মুখ্যমন্ত্রীর এই সুপারিশ মেনেই শেষ পর্যন্ত কুণাল ঘোষকে একদিনের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ । পরে বিধানসভায় এই নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন কুণাল ঘোষ৷ তিনি বলেন, ‘‘আজ পুলিশ বাজেট৷ শোভনদা (শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়) আমার নাম দিয়েছিলেন ৷ তার বদলে আলিফা (আলিফা আহমেদ)-কে দিয়েছিল ৷ আলিফা যে তৈরি হয়ে আসবেন, তারও কোনও সুযোগ নেই ৷ কারণ, তিনি জানেন না যে তাঁর নাম আছে ৷ তিনি এখানে এসে দেখছেন যে তাঁর নাম, অর্থাৎ কোনও ধারালো বক্তৃতা যেন পুলিশ বাজেটে না হয় ৷ তার কারণ, বাকি যাঁরা বলবেন, তাঁরা তো পোষা ৷ বিজেপির বি টিম ৷ আমি দেখেই বিষয়টির বিরোধিতা করেছি ৷ শোভনদাকে জিজ্ঞাসা করেছি, শোভনদা বিরোধীপক্ষের আখেরুজ্জামানকে বলেছেন ৷ আমি আখেরুজ্জামানকে বলেছি ৷ আখেরুজ্জামান আমাকে বললেন, ‘কুণালদা আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ নয় ৷ আপনার নামটা না দেওয়ার জন্য আমার উপর নির্দেশ আছে ৷’ এটা কোনও কথা !’’ কুণাল ঘোষ আরও বলেন, ‘‘পুলিশ নিয়ে আমাদের দলের বক্তব্য আছে ৷ ডামি বক্তা দিয়ে ফাঁকা মাঠে গোল দিচ্ছে বিজেপি৷ আমার কথা শুনল না ৷ বলল বসুন ৷ অধ্যক্ষ ওদের অভিভাবক ৷ অনৈতিকভাবে ওদের বিরোধী করেছেন ৷ অধ্যক্ষ চিৎকার করে বললেন, ‘আপনি বসে কথা বলুন ৷ দাঁড়িয়ে কথা বলবেন না ৷’ আমি কোথায় বসব৷ ওটা তো ওদের বেঞ্চ ৷ তার পরও বলল, ‘বসে বলো ৷’ আমি বসে বললাম ৷ তার পর ওদের এক বিধায়ক বললেন, ‘আপনি এদিকে চলে আসুন, আপনার বলতে কোনও সমস্যা হবে না ৷’ কিন্তু এই পাঠশালায় তো আমি পড়িনি ৷ বলার জন্য আমি গ্রুপ চেঞ্জ করব ৷ এটা কোনও কাজের কথা ! তার পর আমি বলেছি, অন্যায়ভাবে আমার কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে ৷ এটা করছে অনৈতিকভাবে পাওয়া তথাকথিত বিরোধীরা ৷ কিন্তু এরা সরকারপক্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও সরকারপক্ষের নির্দেশ এরা মেনে চলছে ৷ তারা প্রকৃত বিরোধী চাইছে না ৷ তারা কিছু সাজানো পুতুল চাইছে ৷’’