banganews.net

ইতিহাসের দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন অধ্যায় । এক দিকে 1893 সালের 11 সেপ্টেম্বর-শিকাগোর ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক আবির্ভাব । অন্য দিকে 2001 সালের 11 সেপ্টেম্বর, আমেরিকার মাটিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা, যা বদলে দিয়েছিল বিশ্বের নিরাপত্তা-রাজনীতির গতিপথ । 25 বছর পর সেই 11 সেপ্টেম্বরেই 9/11-র ভয়াবহতার স্মরণে বিবেকানন্দের বার্তা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি । 9/11 হামলার 25তম বর্ষপূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করলেন স্বামী বিবেকানন্দের 1893 সালের শিকাগো বক্তৃতা । তাঁর বক্তব্যে উঠে এল সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা এবং মানবতার সেই বার্তা- যার মাধ্যমে এক শতাব্দীরও বেশি আগে বিশ্বমঞ্চে ভারতের কণ্ঠস্বর পৌঁছে দিয়েছিলেন বিবেকানন্দ । 1893 সালের 11 সেপ্টেম্বর শিকাগোতে বসেছিল ‘Parliament of the World’s Religions’ । সেখানেই স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বক্তৃতার শুরুতে শ্রোতাদের সম্বোধন করেছিলেন, ‘Sisters and brothers of America’ বলে । তাঁর এই সম্ভাষণের পর সভাকক্ষে দীর্ঘ করতালির ঢেউ উঠেছিল । ধর্মের মধ্যে বিভেদ নয়, পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সহিষ্ণুতার বার্তাই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ।ঠিক 108 বছর পর, সেই একই তারিখে, আমেরিকার মাটিতে ঘটে যায় আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা । 2001 সালের 11 সেপ্টেম্বর আল-কায়দার জঙ্গিরা চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে । দু’টি বিমান নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া টাওয়ারে আঘাত হানে । তৃতীয় বিমানটি আছড়ে পড়ে পেন্টাগনে । চতুর্থ বিমানটি যাত্রী ও বিমানকর্মীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভেনিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে ভেঙে পড়ে । প্রাণ হারান প্রায় 3 হাজার মানুষ ।সেই ঘটনার 25 বছর পরেও 9/11-র স্মৃতি আমেরিকার জনজীবনে গভীর ভাবে জড়িয়ে রয়েছে । শুক্রবার নিউ ইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো-সহ বিভিন্ন জায়গায় নিহতদের স্মরণে অনুষ্ঠান হচ্ছে । নিহতদের নাম পাঠ, নীরবতা পালন, স্মরণসভা এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফিরে দেখা হচ্ছে সেই ভয়াবহ দিনকে । এ বার প্রথম বার 9/11-র পর বিষাক্ত ধূলিকণার সংস্পর্শে এসে পরবর্তী সময়ে অসুস্থ হয়ে মৃতদেরও বিশেষ ভাবে স্মরণ করা হচ্ছে ।এই আবহেই প্রধানমন্ত্রী মোদির বিবেকানন্দকে স্মরণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে । কারণ, 1893 সালে শিকাগোর মঞ্চ থেকে বিবেকানন্দ যে বার্তা দিয়েছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং বিভিন্ন পথের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান । তাঁর বক্তৃতায় তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির কথা তুলে ধরেছিলেন ।অর্থাৎ একই 11 সেপ্টেম্বর- এক শতাব্দীর ব্যবধানে যেন ইতিহাসের দুই বিপরীত ছবি । এক দিকে বিশ্বধর্ম মহাসভার মঞ্চে ভারতের এক সন্ন্যাসীর কণ্ঠে সম্প্রীতির আহ্বান, অন্য দিকে সন্ত্রাসের ভয়াবহতায় রক্তাক্ত আমেরিকা । সেই দুই ঘটনার যোগসূত্র টেনেই 9/11-র 25 বছর পূর্তিতে বিবেকানন্দের বার্তা স্মরণ করলেন মোদি ।

শুধু আমেরিকাই নয়, 9/11-র অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্বে । হামলার পর আমেরিকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিমান চলাচল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সন্ত্রাস দমনের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসে । আফগানিস্তান ও ইরাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান শুরু হয় । একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কৌশলও নতুন করে নির্ধারিত হয় ।তবে 25 বছর পর 9/11 স্মরণ শুধু শোকের দিন নয় । আমেরিকায় এই দিনটি ‘Patriot Day’ এবং ‘National Day of Service and Remembrance’ হিসাবেও পালিত হয় । নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের জন্য কাজ করার আহ্বানও জানানো হয় ।আর সেই জায়গাতেই যেন নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে 1893-এর শিকাগো । সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন ঘৃণা ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া- বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক বক্তৃতার স্মরণে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই দিকটিই সামনে এল ।