মাঝ-আকাশে বিমানের পাইলটদের মধ্যে মারামারি ! দুবাই থেকে তেল আভিভগামী একটি বাণিজ্যিক বিমানের এই ঘটনায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হল যে, বিমানটির গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবে তাকে জরুরি অবতরণ করানো হয় ৷ একজন পাইলট বিমানটিকে দুর্ঘটনার কবলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে ৷ এই অবস্থায় কোনও রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ঘটনার ঠিক পরপরই ইজরায়েল তাদের যুদ্ধবিমানকে প্রস্তুত রেখেছে । বিমানটির প্রধান পাইলট ভারতীয় বলে জানা গিয়েছে । তাঁকেই আক্রমণ করা হয় । বিমানটি ইচ্ছাকৃতভাবে বিধ্বস্ত বা ছিনতাইয়ের কোনও চেষ্টা হয়েছিল কি না – এই নিয়ে যখন সোশাল মিডিয়ায় নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, তখন ইজরায়েলের কট্টর-ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এক বিবৃতিতে দাবি করেন যে, এক ‘সন্ত্রাসী’ বিমানটি বিধ্বস্ত করে ইজরায়েলিদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল । ইতামার বেন-গভির বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের শত্রুরা জীবনকে ভালোবাসে এবং তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি দেখানো উচিত – এই যে এক ধরনের সরল ধারণা প্রচলিত আছে, আজ সকালে তার অসারতার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া গেল । এক জঙ্গি বিমানটিকে ক্র্যাশ করিয়ে তাতে থাকা 180 জন ইজরায়েলিকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ।”
এপি (AP)-র তথ্য অনুযায়ী, ইজরায়েলি এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ইজরায়েল মনে করছে ঘটনাটি “ইসরায়েলিদের ওপর হামলার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে, তবে এ বিষয়ে তদন্ত এখনও চলছে ।” অন্য একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে বিমানটি ছিনতাই হতে পারে – এমন আশঙ্কায় ইজরায়েল যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রেখেছিল (বা আকাশে পাঠিয়েছিল) ৷ যদিও পরবর্তীতে এএফপি জানায় যে, ছিনতাইয়ের সেই ধারণাটি নাকচ করে দেওয়া হয়েছে ।
‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাইদুবাই ফ্লাইটের যাত্রীরা আতঙ্কজনক পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করেছেন ৷ এর মধ্যে ছিল চিৎকার-চেঁচামেচি, ককপিটে রক্ত এবং বিমানটির হঠাৎ নীচে নেমে যাওয়ার মতো ঘটনা । এক যাত্রী সংবাদমাধ্যমটিকে জানান যে, ককপিট খোলার আগেই তাঁরা চিৎকার শুনতে পান এবং ভেতরে রক্ত দেখতে পান ।
‘দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল’-এর তথ্যমতে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী জানান, “আমরা বিমানে চিৎকার শুনতে পাই । এরপর ককপিট খোলা হলে আমরা রক্ত দেখতে পাই এবং জানতে পারি যে কেউ একজন পকেট-নাইফ বা ছোট ছুরি দিয়ে পাইলটকে আঘাত করেছে ।” তিনি আরও জানান যে, ইজরায়েলি যাত্রীরা বিমানকর্মীদের সঙ্গে মিলে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন ।” ‘ফ্লাইদুবাই’-এর উড়ান এফজেড1073 (FZ1073) বুধবার স্থানীয় সময় সকাল 7টা 5 মিনিটে দুবাই থেকে যাত্রা শুরু করে । বিমানটিতে 180 জন যাত্রী ছিলেন, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই ইজরায়েলি ৷ তবে বিমানটি উড়ান শুরু করার দুই ঘণ্টার মধ্যে একটি জরুরি সংকেত পাঠায় । ফ্লাইট লাইভ-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার24’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি প্রথমে একটি সাধারণ জরুরি সংকেত এবং পরে ‘বেআইনি হস্তক্ষেপ’-এর (unlawful interference) দ্বিতীয় সংকেত পাঠায় ৷ একই সময়ে বিমানটি মাত্র দুই মিনিটের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে 17,400 ফুট নীচে নেমে আসে । ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, ঘটনার সময় বিমানটি জর্ডনের আকাশসীমায় ছিল । এরপর সেটির গতিপথ পরিবর্তন করে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে এটি নিরাপদে অবতরণ করে । ইরান-কেন্দ্রিক উত্তেজনার কারণে ওই অঞ্চলে যখন আগে থেকেই উচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে, ঠিক তখনই ঘটল এই ঘটনা । ইজরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একটি জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক ডেকেছেন ।
বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি নেতানিয়াহুকে অনির্দিষ্ট ও ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল । ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ গোটা ঘটনাটির তদন্ত করছে । ইজরায়েলি দৈনিক ‘হারেৎজ’ (Haaretz) ইজরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, পাইলটদের মধ্যে মারামারির পরই ওই সংকেত পাঠানো হয়েছিল । পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে যে, এই ঘটনার নেপথ্যে বিভিন্ন সম্ভাবনার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে ৷ এর মধ্যে একটি হল – পাইলটদের একজন হয়তো বিমানটিকে দুর্ঘটনার কবলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন ।
ইজরায়েলি টিভি চ্যানেল ‘চ্যানেল 12’ একজন সিনিয়র ইজরায়েলি আধিকারিকের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, “একটি ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে” এবং বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টার অভিযোগে কো-পাইলটকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে ।
ফ্লাইদুবাইয়ের এক মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বিমানটি তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং সকল যাত্রী সুস্থ ও নিরাপদ আছেন । মুখপাত্র বলেন, “আমাদের দলগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে ।”

