রাজ্যে মাথাচাড়া দেওয়া গ্যাস সংকট এবং তার জেরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা রুখতে এবার সরাসরি ময়দানে নামল রাজ্য প্রশাসন । গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং বেআইনি পথে পাচার রুখতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া বার্তার পরই, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে একটি বিস্তারিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর’ বা এসওপি (SOP) জারি করা হয়েছে । এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হল সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনা, সমন্বয়ের মাধ্যমে নজরদারি চালানো এবং সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি করা । বিশেষ করে স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিল, আইসিডিএস পরিষেবা, হাসপাতালের রোগীদের খাবার এবং অত্যাবশ্যকীয় গার্হস্থ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে যাতে কোনওরকম ব্যাঘাত না-ঘটে, তা এই নির্দেশিকায় সুনিশ্চিত করা হয়েছে । প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করতে নবান্নে ইতিমধ্যেই একটি 24 ঘণ্টার ‘স্টেট এলপিজি কন্ট্রোল রুম’ চালু করা হয়েছে । রাজ্যের সর্বত্র এলপিজি-র প্রাপ্যতা, মজুত ভাণ্ডার এবং পরিবহণের উপর সর্বক্ষণ নজর রাখবে এই কন্ট্রোল রুম । জরুরি যোগাযোগের জন্য কন্ট্রোল রুমের ল্যান্ডলাইন নম্বর (1070 /033-2214-3526) এবং মোবাইল নম্বর (8697981070) চালু করা হয়েছে । পাশাপাশি, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘স্টেট কমিটি’ গঠন করা হয়েছে । এই কমিটিতে রয়েছেন স্কুল শিক্ষা, বিপর্যয় মোকাবিলা, স্বাস্থ্য, শিল্প, খাদ্য ও সরবরাহ, পরিবহণ এবং স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিব ও অতিরিক্ত মুখ্যসচিবরা । এছাড়া রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা), কলকাতা পুলিশের কমিশনার এবং আইবি ও এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের এডিজি-রাও এই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য । রাজ্যজুড়ে এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানির মজুত এবং বণ্টনের রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়ার জন্য একটি রাজ্য-স্তরের ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডও তৈরি করা হবে ।গ্যাসের কৃত্রিম আকাল রুখতে এসওপি-তে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । ইন্ডিয়ান অয়েল, এইচপিসিএল এবং বিপিসিএল-এর মতো তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলিকে (OMCs) শহর ও গ্রামাঞ্চলের গার্হস্থ্য উপভোক্তা এবং অত্যাবশ্যকীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে বলা হয়েছে । গার্হস্থ্য পরিবার, হাসপাতাল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, স্কুল-কলেজ এবং সরকারি হোস্টেলগুলিকে এই অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে । সাধারণ মানুষের বাড়িতে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে, প্রয়োজনে সিঙ্গল-সিলিন্ডার গ্রাহকদের গ্যাস বুকিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে । গ্যাস পরিবহণ দ্রুততর করতে এলপিজি ট্যাঙ্কারগুলিকে অত্যাবশ্যকীয় পরিবহণের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে পুলিশি পাহারায় ‘গ্রিন করিডোর’ তৈরি করে গ্যাস সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে কালোবাজারি রুখতে জারি করা নির্দেশিকাগুলিতেও । জেলাশাসকদের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলায় ‘ডিস্ট্রিক্ট এলপিজি মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হবে, যারা ডিস্ট্রিবিউটরদের মজুত খতিয়ে দেখবে এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধান করবে । গার্হস্থ্য এলপিজি সিলিন্ডারের বেআইনি মজুত, কালোবাজারি, অতিরিক্ত দাম নেওয়া এবং অন্য খাতে ঘুরিয়ে দেওয়া রুখতে কড়া পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । এই ধরনের অপরাধমূলক কাজ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত আইনে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করবে প্রশাসন । এই নজরদারির ফলে প্রকৃত চাহিদা এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্কের বশে তৈরি হওয়া কৃত্রিম চাহিদার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে সুবিধা হবে বলে প্রশাসন মনে করছে । এলপিজি-র উপর চাপ কমাতে বিকল্প জ্বালানির বন্দোবস্ত করার দিকেও জোর দিয়েছে রাজ্য । বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় গণবণ্টন ব্যবস্থা (PDS) এবং খোলা বাজারে কেরোসিনের জোগান বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । পরিবহণ ক্ষেত্রকে যতটা সম্ভব সিএনজি-র দিকে ঝোঁকার উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে । মানুষ যাতে অযথা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত গ্যাস বুকিং বা মজুত না করেন, তার জন্য নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর কথাও বলা হয়েছে এসওপি-তে । এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের গ্যাস বা জ্বালানি সংক্রান্ত জরুরি অভিযোগ জানানোর জন্য রাজ্য পুলিশের তরফে তিনটি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর—033 49506101, 033 35026214 এবং 033 24874400 চালু করা হয়েছে । রাজ্য সরকার আশাবাদী, প্রশাসনের এই বহুমুখী ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে দ্রুত এই গ্যাস সংকটের সমাধান হবে এবং সাধারণ মানুষ হয়রানির হাত থেকে রেহাই পাবেন ।


