শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে গুলি করে খুনের ঘটনায় তদন্তে নেমে তিনজনকে আটক করল রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ । যদিও তদন্তের স্বার্থে এখনই আটক ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাইছে না তদন্তকারীরা। সূত্রের খবর, ধৃতদের জেরা করে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে ৷ বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোলতলা সংলগ্ন দোহারিয়া এলাকায় হামলার মুখে পড়েন চন্দ্রনাথ রথ । অভিযোগ, একটি মোটরবাইকে করে দুষ্কৃতীরা তাঁর গাড়ির পিছু নেয় । দোহারিয়ার একটি বাইপাস রোডে পৌঁছতেই সামনে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে অন্য একটি ছোট চারচাকা গাড়ি । তারপরই বাইক আরোহীরা চন্দ্রনাথের গাড়ি ঘিরে ধরে গুলিবৃষ্টি শুরু করে বলে অভিযোগ । মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে যায় চন্দ্রনাথদের গাড়ি । মনে করা হচ্ছে, ওই ছোট চারচাকার গাড়িটিও দুষ্কৃতীদের ভাড়া করা ৷ গুলিতে গুরুতর জখম হন চন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গী বুদ্ধদেব বেরা । হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন । আশঙ্কাজনক অবস্থায় বুদ্ধদেবকে রাতেই কলকাতার একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় । তাঁর চিকিৎসা চলছে । খুনকাণ্ডের তদন্তে ইতিমধ্যে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করেছে রাজ্য পুলিশ । বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মধ্যমগ্রামের দোহারিয়া এলাকায় পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছেন সিটের আধিকারিকরা । ঘটনাস্থলে গিয়েছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দলও । নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি গোটা এলাকা ঘিরে রেখে চলছে খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের কাজ । তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে, যা তদন্তে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, যে গাড়িতে বসেছিলেন চন্দ্রনাথ রথ, সেটিকেও বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে । গাড়ির দরজা, কাচ, সিট ও ভেতরের বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা। গুলির গতিপথ, কত দূর থেকে গুলি চালানো হয়েছে এবং হামলাকারীরা কোন দিক থেকে এসেছিল, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে । মূলত কী ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছে । উদ্ধার হওয়া বুলেট ও কার্তুজের খোল ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে । প্রাথমিক অনুমান, অত্যন্ত কাছ থেকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল । পুলিশ সূত্রের দাবি, এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে । হামলাকারীদের গতিবিধি বোঝার জন্য ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আটক তিন ব্যক্তির মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন ও কল ডিটেলসও পরীক্ষা করা হচ্ছে । তদন্তকারীদের মতে, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এবং এর পিছনে বড় কোনও চক্র জড়িত থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুধবার রাত থেকেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায় মধ্যমগ্রামে । খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত । সাংবাদিকদের তিনি জানান, দুষ্কৃতীদের ব্যবহৃত একটি চারচাকা গাড়ি আটক করা হয়েছে । এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে হামলাকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে । তবে তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি । যেখানে গুলি চালানো হয়েছিল, সেই এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ । সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে । চন্দ্রনাথের আবাসন সংলগ্ন এলাকাতেও মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান । চলছে টহলদারি । এদিকে বুধবার গভীর রাতে মধ্যমগ্রামের হাসপাতাল থেকে চন্দ্রনাথ রথের দেহ পাঠানো হয় বারাসত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে । দ্রুত ময়নাতদন্তের জন্য বিভাগীয় প্রধান-সহ দুই সহকারী অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে । তদন্তকারীদের আশা, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকেই হামলার ধরন এবং কত রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে ।

রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে । ভোট-পরবর্তী বাংলার অশান্ত আবহে এই খুন নতুন করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল বলেই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের । এখন দেখার, তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে ৷