আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর রাজ্য ছাড়া নিয়ে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হল রাজ্য রাজনীতিতে । রবিবার সকালে আইপ্যাকের কাজ বন্ধের খবর সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তৃণমূল কংগ্রেস আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল । কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তারকেশ্বরের জনসভা থেকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য সেই জল্পনাকে শুধু উসকেই দিল না, বরং গোটা পরিস্থিতি নিয়ে প্রবল ধোঁয়াশার সৃষ্টি করল । দলের অফিশিয়াল বিবৃতি এবং তৃণমূল নেত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যের এই বিস্তর ফারাক রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে । রবিবার তারকেশ্বরের নির্বাচনী সভা থেকে এই আইপ্যাক ইস্যুতেই কেন্দ্রীয় সরকার ও তদন্তকারী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর বক্তব্যে কার্যত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থার কর্মীদের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে । মমতা বলেন, “আমাদের তো রোজই ইডি রেড করছে । ইলেকশনের সময় মনে পড়ল ? যারা আমাদের পার্টির কাজ করে তাদের বলছে বাংলা ছেড়ে চলে যাও । তোমাদের তো পঞ্চাশটা আছে । আমাদের একটা আছে ।” এখানেই না থেমে, আইপ্যাক কর্মীদের কর্মহীন হওয়ার জল্পনাকে একপ্রকার মান্যতা দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, “শুনুন ওদের ভয় দেখালে, ওরা আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হবে । আমরা ওদের চাকরি দেব । আমি একটি ছেলেকেও চাকরিছাড়া করব না ।” সকালে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই বিষয়ে তাঁর কথাও হয়েছে বলে জানান মমতা । ক্ষুব্ধ নেত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি, “পরিষ্কার বলি, আপনাদের এই চক্রান্ত মেনে নেব না । আর কত অত্যাচার করবেন ? আর কত ভোট কাটবেন ? এর পর তো এনআরসি করবেন ।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পরেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রবল ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ, রবিবার সকালেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে একটি কড়া বিবৃতি জারি করে বলা হয়েছিল, আইপ্যাকের কাজকর্ম 20 দিনের জন্য স্থগিত রাখার খবরটি সর্বৈব মিথ্যা । সেখানে স্পষ্ট দাবি করা হয়েছিল, আইপ্যাকের টিম পূর্ণ উদ্যমে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং প্রচারের কাজ রাজ্য জুড়ে পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছে ।
ঘটনার সূত্রপাত এদিনের একটি খবরকে ঘিরে ৷ জানা যায়, আইপ্যাক কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত সংস্থার সমস্ত কর্মীকে অবিলম্বে কাজ বন্ধ করে আগামী 20 দিনের জন্য সাময়িক ছুটিতে যেতে বলা হচ্ছে । আগামী 11 মে-র পর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কর্মীদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হবে এবং পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের রূপরেখা বা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হবে । কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো ওই ইমেলে আইপ্যাক কর্তৃপক্ষ জানায়, “আইনকে আমরা সর্বদা শ্রদ্ধা করি এবং গোটা আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছি । নির্দিষ্ট সময়ে আমরা সুবিচার পাব বলে নিশ্চিত ।” এই ডামাডোলের পরিস্থিতিতে কর্মীদের শান্ত ও ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং যে কোনও প্রয়োজনে তাঁরা যাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সেই বার্তাও দেওয়া হয়েছে । এর অব্যবহিত পরেই আইপ্যাক (I-PAC)-এর কাজ বন্ধের খবরকে কড়া ভাষায় নস্যাৎ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল । রবিবার একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করে শাসকদলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, আগামী 20 দিনের জন্য আইপ্যাকের কাজকর্ম স্থগিত রাখার যে দাবি সংবাদমাধ্যমে করা হচ্ছে, তা ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’। তৃণমূলের দাবি, ময়দানের প্রকৃত পরিস্থিতি থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতেই এই ধরনের খবরের অবতারণা করা হচ্ছে । এদিকে শাসকদলের তরফে বলা হয়, বাংলার মানুষ এই ধরনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চেষ্টাগুলি বুঝতে সম্পূর্ণ সক্ষম এবং তাঁরা গণতান্ত্রিকভাবেই এর যোগ্য জবাব দেবেন । ভীতি প্রদর্শন বা ভুল তথ্যের দ্বারা বাংলাকে টলানো যাবে না বলে উল্লেখ করে তৃণমূল জানিয়েছে, আগামী 23 ও 29 তারিখ মানুষ চূড়ান্ত রায় দেবেন এবং 4 মে নির্বাচনী ফলাফলেই তার প্রতিফলন ঘটবে । কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর কথায় যখন উঠে আসছে যে, কর্মীদের ‘বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়ার’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং দল তাঁদের ‘চাকরি’ দেওয়ার কথা ভাবছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দলের সকালের দেওয়া বিবৃতির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে । এই নজিরবিহীন জল্পনা এবং বিভ্রান্তির নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েকদিনের ঘটনাক্রম । সম্প্রতি ইডি আইপ্যাকের কলকাতার কার্যালয় এবং কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাসভবনে তল্লাশি চালায় । সেই তল্লাশি চলাকালীন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এবং বেশ কিছু নথি নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে । এরপর কয়লা পাচার মামলায় আইপ্যাকের অন্যতম পরিচালক বিনেশ চান্দেলের গ্রেফতারি পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে তোলে । অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একে ‘ভীতি প্রদর্শন’ আখ্যা দিয়েছিলেন । সব মিলিয়ে, আইপ্যাক রাজ্যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে, নাকি কেন্দ্রীয় সংস্থার চাপে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে – সেই নিয়ে এখন শাসক দলের অন্দরেই দু’রকম বার্তা মিলছে । একদিকে দল অফিশিয়ালি বলছে সব ঠিক আছে, অন্যদিকে খোদ দলনেত্রী বলছেন ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হলে কর্মীদের তৃণমূল দলেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে । নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে ভোটকুশলী সংস্থাকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরের এই চূড়ান্ত বিভ্রান্তি আদতে দলের প্রচার কৌশলে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার ।

