রাজ্য বিধানসভায় নতুন সরকারের পেশ করা প্রথম বাজেটকে আদ্যোপান্ত ‘কেন্দ্র নির্ভর’ বলে কটাক্ষ করল মমতাপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস। বাজেট পেশের পর বিধানসভা চত্বরে সাংবাদিক বৈঠক করে কুণাল ঘোষ এবং মদন মিত্র সোমবার দুপুরে দাবি করেছেন, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার হাজারো বঞ্চনা সত্ত্বেও আত্মনির্ভর বাংলার বাজেট পেশ করত ৷ সেখানে বর্তমান বাজেটে সরকারের নিজস্ব আয়ের কোনও স্পষ্ট দিশা নেই। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কুণাল জানান, এই নতুন সরকার সবেমাত্র ক্ষমতায় এসেছে ৷ এখনই তাদের চরম বিরোধিতায় না-গিয়ে কাজ করার জন্য কিছুটা সময় দিতে চায় তৃণমূল । ইতিবাচক এবং জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলিকে সমর্থন করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তবে বাজেটের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে প্রাপ্য টাকা দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। আবাস যোজনা বা একশো দিনের কাজের টাকা আটকে রাখা হয়েছিল। দু’লক্ষ কোটি টাকার বেশি রাজ্যের প্রাপ্য মেটানো হয়নি ৷ প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও অন্য রাজ্যের মতো বাংলার পাশে দাঁড়ায়নি কেন্দ্র। তা সত্ত্বেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রতিবার আত্মনির্ভর বা স্বনির্ভর বাংলার বাজেট পেশ করত। কিন্তু আজকের এই বাজেট পুস্তিকা আগাগোড়া কেন্দ্রীয় সরকার নির্ভর। সরকারের নিজস্ব আয় কোথা থেকে আসবে বা বিপুল ব্যয়ের টাকার জোগান কীভাবে হবে, তার কোনও স্পষ্ট রূপরেখা এই বাজেটে নেই।”সামাজিক সুরক্ষার একাধিক প্রকল্প নিয়েও এদিন প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিকে একসময় বিজেপি ‘ভাতা’ বা ‘ভিক্ষা’ বলে কটাক্ষ করত, আজ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় তারাই সেই প্রকল্পগুলিকে নিজেদের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি কুণালের।

অন্নপূর্ণা যোজনায় 25 থেকে 60 বছর বয়সী ‘যোগ্য’ মহিলাদের মাসিক 3 হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাজেটের এই ‘যোগ্য’ শব্দটিতে তীব্র আপত্তি তুলে তৃণমূল মুখপাত্র বলেন, “আগের সরকারের আমলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সকলেই পেতেন। কিন্তু এখানে যোগ্য মহিলার মাপকাঠি কী, তা স্পষ্ট করা হয়নি।”স্বাস্থ্য খাতে আয়ুষ্মান ভারত চালুর কথা বলা হলেও, যাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না, তাঁদের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। তৃণমূলের প্রশ্ন, আনুমানিক 7 কোটি মানুষ এই প্রকল্পের আওতায় এলে, যাঁরা বাদ পড়বেন তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর তহবিল থেকে সর্বাধিক ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্তই বা কেন পাবেন? এই শর্ত চাপিয়ে গরিব মানুষের প্রতি বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয় বলে কুণালদের দাবি ।এ ছাড়াও, বাজেটে ঘোষিত বহু পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পের ভিত আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেই তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছে রাজ্যের প্রাক্তন সাংসদ দল ৷ মুড়িগঙ্গা নদীর উপর সাগরদ্বীপে যাওয়ার সেতু নির্মাণের যে বিবেচনাধীন প্রস্তাব এই বাজেটে রাখা হয়েছে, তা পূর্বতন সরকার আগেই ঘোষণা করেছিল বলে কুণাল ঘোষ স্মরণ করিয়ে দেন।পাশাপাশি, সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশের মতো পদগুলির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি করে দেওয়া পদগুলির পরিকাঠামো মেনেই বর্তমান সরকার কাজ এগোচ্ছে। বিধায়কদের এলাকা উন্নয়ন তহবিল বাড়ানোর প্রস্তাবকে তৃণমূল স্বাগত জানালেও কুণাল আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নোডাল এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করতে গেলে যেন অহেতুক জটিলতার শিকার না হতে হয়। রাস্তার নাম পরিবর্তন এবং সংখ্যালঘু উন্নয়ন নিয়েও এদিন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঘাসফুল শিবির। কলকাতার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন করে গোপাল মুখার্জি রোড করার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বলে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তথা বিশিষ্ট চিকিৎসকের নামাঙ্কিত রাস্তার এই নামবদল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

অন্যদিকে, সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে বাজেট বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে সরব হন মদন মিত্র। সাংবাদিক বৈঠকের শেষে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কড়া আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, “এরা ক্ষমতায় আসার আগে স্লোগান দিয়েছিল সবকা সাথ, সবকা বিকাশ। কিন্তু প্রথম বাজেটেই তারা প্রমাণ করে দিল যে সবার বিকাশ নয়, তারা শুধু নিজেদের পছন্দের লোকেদেরই বিকাশ চায়। এটা পুরোপুরি মিথ্যাচার।”