2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় ও চরম ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে আছড়ে পড়ল ক্ষোভের সুনামি । নির্বাচনী ফলাফলের রেশ কাটতে না-কাটতেই ঘাসফুল শিবিরের দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া নেতারা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন । হারের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে তাঁদের নিশানায় উঠে এসেছে দলের ‘কর্পোরেটাইজেশন’, ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC) এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যপদ্ধতি । জোড়াসাঁকোর প্রাক্তন বিধায়ক বিবেক গুপ্ত থেকে শুরু করে কাশীপুর-বেলগাছিয়ার পরাজিত প্রার্থী অতীন ঘোষ, ফরাক্কার প্রাক্তন বিধায়ক মণিরুল ইসলাম কিংবা বেহালা পশ্চিমের বিদায়ী বিধায়ক রত্না চট্টোপাধ্যায় – হেভিওয়েট নেতাদের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছে । দলের এই বিপর্যয়ের জন্য ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাকের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এনেছেন জোড়াসাঁকোর প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক বিবেক গুপ্ত । রাজনৈতিক তথ্য ফাঁসের মারাত্মক অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “আইপ্যাক হচ্ছে একদম চিটিংবাজ, গদ্দার, চোর। ওই ডেটা যে আইপ্যাক বিজেপিকে দিত না, তার গ্যারান্টি কে নেবে ? আমাদের পার্টির অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ের লিঙ্ক বিজেপির কাছে থাকত ।” শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিচুতলার দূরত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, দলে তাঁর নাকি কোনও অবদানই নেই বলে শুনতে হয়েছে । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইপ্যাকের এই ভূমিকা সম্পর্কে অবগত ছিলেন কি না, তা নিয়েও সন্দিহান তিনি, কারণ শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছনোর কোনও সুযোগই সাধারণ নেতাদের ছিল না ।
শুধু আইপ্যাক নয়, দলের অন্দরে তৈরি হওয়া ‘পুরনো বনাম নতুন’ দ্বন্দ্ব এখন একেবারে প্রকাশ্যে । তৃণমূল স্তর থেকে উঠে না আসা এবং প্রযুক্তি-নির্ভর রাজনীতির কড়া সমালোচনা করেছেন কাশীপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্রের পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী অতীন ঘোষ । তাঁর বক্তব্য, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আজকালকার আধুনিক নেতা । তিনি তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসেননি । আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৃণমূল স্তরের মানুষের পালস জানা যায় না ।” ব্যারাকপুর পুরসভার চেয়ারম্যান উত্তম দাসের গলাতেও শোনা গিয়েছে একই আক্ষেপ । তাঁর মতে, 1998 সাল থেকে যাঁরা রক্ত জল করে দল করছেন, তাঁদের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রজন্মের চিন্তাভাবনার বিস্তর ফারাক তৈরি হয়েছে ।
নতুন প্রজন্মের নেতাদের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য এবং অহংকারের অভিযোগ তুলেছেন বেহালা পশ্চিমের বিদায়ী বিধায়ক তথা পরাজিত প্রার্থী রত্না চট্টোপাধ্যায় । তিনি জানান, নেতারা এখন আর নিচুতলার কর্মীদের কথা শুনতে চান না, বরং সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন । তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ আক্রমণ শানিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী এবং ফরাক্কার প্রাক্তন বিধায়ক মণিরুল ইসলাম ।
কৃষ্ণেন্দুনারায়ণের কথায়, “দলের বিপর্যয়ের পিছনে একজনই ব্যক্তি রয়েছে, যে দলটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিল, তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ।” মণিরুল ইসলাম আরও একধাপ এগিয়ে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “বাংলার মানুষ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেনি । উনি সাংসদ ও বিধায়কদের চাকর মনে করতেন । আমার মতে উনি অভিষেক নন, অভিশাপ ।” দলের বর্তমান সাংগঠনিক কঙ্কালসার দশার কথা তুলে ধরেছেন নারায়ণগড়ের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সূর্যকান্ত অট্ট । তাঁর দাবি, বর্তমানে তৃণমূলের সংগঠন বলে কিছুই অবশিষ্ট নেই । জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি জানান, কোনও সাংসদ বা বিধায়ক গেলে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘরেও তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হত না । সব মিলিয়ে, 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর তৃণমূল কংগ্রেস এক গভীর সাংগঠনিক সঙ্কটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে । একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগাশ্রয়ী রাজনীতি এবং অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্পোরেট ধাঁচে দল পরিচালনার চেষ্টা – এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দলের দীর্ঘদিনের কর্মীরা যে নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেন, তা বিক্ষুব্ধ নেতাদের বয়ানেই স্পষ্ট । আগামীর পথ প্রশস্ত করতে এবং এই ক্ষোভের আগুন নেভাতে শীর্ষ নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর ওয়াকিবহাল মহলের ।

