ভোটমুখী বঙ্গে ভিনরাজ্য থেকে ভোটারদের রাজ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে ৷ গতকাল রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে গিয়ে এই অভিযোগ করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ সেই অভিযোগের রেশ টেনে মঙ্গলবার সরাসরি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কড়া চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ অভিষেক অভিযোগ করেন, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে ভিনরাজ্যের ভোটারদের বাংলায় ঢোকাচ্ছে বিজেপি ৷ এই কাজে গেরুয়া শিবিরকে সম্পূর্ণ মদত দিচ্ছে খোদ জাতীয় নির্বাচন কমিশন ৷ তাঁর দাবি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে প্রায় 30 হাজার অবৈধ ‘ফর্ম-6’ (নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন) জমা পড়েছে সিইও দফতরে ৷ এই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সিইও দফতরের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনার দাবি তুলেছেন তিনি ৷ এরপর এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিতে অভিযোগ করেছেন, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের একাংশের যোগসাজশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করার এক সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছে রাজ্যে ৷ নির্ভরযোগ্য সূত্রের উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কার্যালয়ে এবং রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিজেপি এজেন্টদের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ‘ফর্ম ৬’ (নতুন ভোটার হওয়ার আবেদনপত্র) জমা দেওয়া হচ্ছে ৷ বিষয়টির আইনি দিক এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন ৷ চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, “এগুলি ভোটার তালিকায় নাম তোলার সাধারণ বা রুটিন আবেদন বলে মনে হচ্ছে না; বরং বহিরাগতদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার একটি অশুভ ও চক্রান্তমূলক পদক্ষেপ ৷” তৃণমূল সুপ্রিমোর আশঙ্কা, এই আবেদনকারীরা পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা নন ৷ এই রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের কোনও বৈধ সংযোগ নেই ৷ এর আগে বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির নির্বাচনেও ঠিক একই ধরনের কারচুপির কৌশল নজরে এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি ৷ এই চিঠি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকার হরণ করার চেষ্টা করছে ৷ তিনি চিঠিতে গত 20 ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আদেশের (W.P.(C) No. 1089 of 2025) কথা উল্লেখ করেছেন ৷ শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, জমা দেওয়া নথিপত্রের সত্যতা যাচাই এবং ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জেলা পর্যায়ে বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের (Judicial Officers) নিয়োগ করা হয়েছিল ৷ গত 28 ফেব্রুয়ারি রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয় ৷ সেখানে প্রায় 60 লক্ষ ভোটারদের মামলা বিচারের জন্য ছিল ৷ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই বিচার প্রক্রিয়া এখনও চলছে এবং নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে চারটি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করেছে ৷ মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ভোটার তালিকার আইনি বিচার প্রক্রিয়া চলছে, সেই সময়ে সিইও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নতুন করে প্রায় 30 হাজার ‘ফর্ম 6’ আবেদন গ্রহণ করেছেন ৷ তৃণমূলের আশঙ্কা, সংশ্লিষ্ট বুথ বা রাজনৈতিক দলগুলিকে কোনও যথাযথ নোটিশ না দিয়েই কমিশন এই সমস্ত আবেদন একতরফাভাবে অনুমোদন করে নেবে ৷ চিঠিতে বলা হয়েছে, গত 27 মার্চ মেমো নম্বর 3420-Home(Elec) অনুযায়ী, মনোনয়নের শেষ দিন পর্যন্ত 6 নম্বর ফর্ম এবং 8 নম্বর ফর্ম-এর মাধ্যমে নাম সংযোজন বা সংশোধনের যে ঢালাও অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশের চরম পরিপন্থী ৷ এই নিয়ম মূলত সীমিত উদ্দেশ্যে এবং হবু প্রার্থীদের সুবিধার জন্য তৈরি, গণ-আবেদন বা হাজার হাজার বহিরাগতদের নাম তোলার জন্য নয় ৷ আইনি যুক্তির পাশাপাশি এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের কথাও চিঠিতে তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী ৷ তিনি জানিয়েছেন, ত্রুটিপূর্ণ এবং দৃশ্যত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (Special Intensive Revision)-এর কারণে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন এবং অনেকে নিজেদের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন ৷ এই অমানবিক প্রক্রিয়ায় রাজ্যে ইতিমধ্যে দুশো’রও বেশি মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন মুখ্যমন্ত্রী । এত বড় ঘটনার পরেও কমিশনের নীরবতা ও সংবেদনশীলহীন দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি ৷
সোশাল মিডিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারতীয় সংবিধানের 324 নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নিজের খেয়ালখুশিমতো কোনও নিয়ম তৈরি করতে পারে না, যা 1960 সালের সংবিধিবদ্ধ বিধির (Registration of Electors Rules) বিরোধী ৷ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় এই বেআইনি অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো ৷

