রাজ্য মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বড়সড় পদক্ষেপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ৷ কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশিকা মেনে এবার রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণের নয়া তালিকা প্রকাশ করল নবান্ন। রাজ্যের অনগ্রসর কল্যাণ দফতরের তরফে জারি করা এই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এখন থেকে রাজ্যের 66টি শ্রেণি বা জাতি রাজ্য সরকারের অধীনস্থ চাকরিতে 7 শতাংশ ওবিসি সংরক্ষণের সুবিধা পাবে ৷ 16 মে, 2026 তারিখে রাজ্যপালের সম্মতিক্রমে এই নির্দেশিকাটি সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়েছে ৷ 2024 সালের 22 মে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেছিল ৷ 2011 সালের মূল মামলা-সহ 2010, 2012, 2013 এবং 2020 সালের একাধিক রিট পিটিশনের দীর্ঘ শুনানির পর ওই রায় দেয় আদালত ৷ সেই রায়ে 2010 সালের পর থেকে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একাধিক জাতির শংসাপত্র বাতিল করা হলেও, 2010 সালের আগে তৈরি হওয়া রাজ্যের 66টি জাতির ওবিসি তকমা বহাল রাখা হয়। তবে সংরক্ষণ বণ্টনের ক্ষেত্রে বড় রদবদল করেছিল আদালত। পূর্বতন নিয়মে ওবিসি ‘এ’ এবং ওবিসি ‘বি’ ক্যাটেগরির জন্য যথাক্রমে 10 শতাংশ ও 7 শতাংশ যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল, তা খারিজ করে দেয় হাইকোর্ট। পরিবর্তে নির্দেশ দেওয়া হয়, রাজ্যের এই অপরিবর্তিত 66টি শ্রেণি বা জাতির জন্য সব মিলিয়ে 7 শতাংশ সংরক্ষণই বলবৎ থাকবে ৷ হাইকোর্টের সেই রায়কে মান্যতা দিয়েই রাজ্য সরকারের অনগ্রসর কল্যাণ দফতর এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ৷ রাজ্যের অনগ্রসর কল্যাণ দফতরের সচিব সঞ্জয় বনশলের স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন চাকরি ও পদের ক্ষেত্রে এখন থেকে এই 66টি তালিকাভুক্ত শ্রেণি 7 শতাংশ সংরক্ষণের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করার পথে হাঁটল রাজ্য। এর ফলে এই 66টি শ্রেণির চাকরিপ্রার্থীদের আর কোনও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হবে না বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। নতুন এই বিজ্ঞপ্তিতে সেই 66টি জাতির সম্পূর্ণ তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকায় রাজ্যের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই বিভিন্ন শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে এই তালিকায় রয়েছে কপালী, বৈশ্য কপালী, কুর্মি, সূত্রধর, কর্মকার, কুম্ভকার, স্বর্ণকার, তেলি, নাপিত, যোগী, গোয়ালা, ময়রা, বারুই, সৎচাষী এবং মালাকারের মতো জাতিগুলি। পাশাপাশি, মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশ কিছু শ্রেণি এই 7 শতাংশের আওতায় পড়ছে ৷ এর মধ্যে রয়েছে জোলা (আনসারি-মোমিন), ওবিসি তালিকায় থাকা ফকির, হাওয়ারি বা ধোবি, কসাই, নস্য-সেখ, পাহড়িয়া মুসলিম, হাজ্জাম এবং চৌধুলির মতো সম্প্রদায়। তফসিলি জাতি থেকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া ব্যক্তি ও তাঁদের বংশধররাও এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাছাড়া, রাজ্যের নানা প্রান্তের, বিশেষ করে পাহাড় ও জঙ্গলমহল লাগোয়া এলাকার একাধিক জনজাতির উল্লেখ রয়েছে এই বিজ্ঞপ্তিতে। দার্জিলিং ও পাহাড় লাগোয়া এলাকার ভুজেল, নেওয়ার, মাঙ্গার, নেমবাং, সামপাং, রাই (চামলিং সহ), থামী প্রভৃতি সম্প্রদায় এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে কাঁসারি, তাঁতি, ধানুক, শাঁখারি, রাজু, সরাক, তাম্বোলি, এবং চিত্রকরের মতো পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, সংরক্ষণের আইনি অধিকার সুরক্ষিত করতেই নবান্নের এই পদক্ষেপ। ক্যাটেগরি ‘এ’ এবং ‘বি’-এর সংরক্ষণের হার বাতিল হয়ে গিয়ে সামগ্রিকভাবে 7 শতাংশের এই নতুন নিয়ম রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীদের ওপর বাস্তবে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার।

