রাজ্যে হকার উচ্ছেদ অভিযান এবং বুলডোজার রাজনীতির বিরুদ্ধে এবার বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথে হাঁটার কথা ঘোষণা করলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ মঙ্গলবার কালীঘাটে তৃণমূল বিধায়কদের সঙ্গে দলের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকে একইসঙ্গে রাজ্য সরকার এবং ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নোটিশ বা বুলডোজারের হুমকিতে তিনি যে কোনোভাবেই মাথা নত করবেন না, তা এদিন দলের সব বিধায়কের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন অভিষেক। এদিনের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, আগামী দিনে দিল্লির বর্তমান সরকারের পতন একেবারে অবশ্যম্ভাবী। অতএব লড়াই থেকে সরে গেলে চলবে না। এই বৃহত্তর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হল রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হকার এবং দিনমজুরদের রুটিরুজি ও সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে সরাসরি অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, নতুন সরকারের বুলডোজার নীতি এবং অবিবেচক উচ্ছেদ অভিযানের জেরে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার দরিদ্র পরিবারের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তাই এই প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া মানুষদের পাশে দাঁড়াতেই ফের একবার রাজপথে নেমে বড়সড় গণআন্দোলন গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরমহলের খবর অনুযায়ী, এই ‘জীবন-জীবিকা বাঁচাও কর্মসূচি’র মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস একদিকে যেমন তাদের জনসংযোগ আরও নিবিড় করতে চাইছে, তেমনই অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষকে সংঘবদ্ধ করে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে চাইছে। এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে দলের শীর্ষ নেতা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কাউন্সিলর, ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় স্তরের কর্মীদের বিপুল অংশগ্রহণ থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। কালীঘাটে আয়োজিত দলীয় বিধায়কদের এই বিশেষ বৈঠকে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় শাসক দলকে আক্রমণ করেন দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ভয় দেখানোর রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো ধরনের অগণতান্ত্রিক চাপের কাছেই তৃণমূল কংগ্রেস কখনও আপস করবে না। দলীয় বিধায়কদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, তাঁকে যত খুশি নোটিশ পাঠানো হোক না কেন, এমনকি তাঁর বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেও তিনি কিছুতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বিজেপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁর এই আপসহীন লড়াই নিরন্তর চলবে। এর পাশাপাশি, নাম না করে এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করে অভিষেক বলেন যে, “দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অনেক মুখ্যমন্ত্রী এসেছেন, কিন্তু রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর মতো আগে কেউ ছিলেন না। যাকে প্রকাশ্য ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখা গিয়েছিল, তাকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে”, তীব্র কটাক্ষ করেন তিনি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। অন্যদিকে, দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই দলীয় বৈঠক থেকে সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, দিল্লির বর্তমান শাসকদলের পতন এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন যে, আগামী দিনগুলোতে দিল্লি থেকে বিজেপি নিশ্চিতভাবে ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের জন্য সবাইকে শুধু কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকেও এই মেগা বৈঠকের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভয়, ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকির নোংরা রাজনীতি তৃণমূল কংগ্রেসের লড়াকু মনোবল কোনোভাবেই ভেঙে দিতে পারবে না। সাধারণ মানুষের অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং সার্বিক কল্যাণের জন্য তৃণমূল কংগ্রেস সর্বদাই সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করে এসেছে এবং আগামী দিনেও সেই গৌরবময় ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলা হোক বা দিল্লি— সর্বত্রই জনস্বার্থে এই রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেস যে সম্পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ, কালীঘাটের এই হাইভোল্টেজ বৈঠক থেকে সেই বার্তাই আরও একবার সুনিষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হল ।