এবার রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তরেও রদবদল করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার নবান্নের কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার দফতরের তরফে জারি করা একটি বিজ্ঞপ্তি ঘিরে প্রশাসনিক মহলে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। নজিরবিহীন এই রদবদলে রাজ্যের 18 জন শীর্ষ আইএএস অফিসারের দফতর বদল করা হয়েছে, যা নতুন সরকারের প্রশাসনিক রাশ শক্ত করার স্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মুখ্যমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী যে লাল ফিতের ফাঁস আলগা করতে এবং সরকারি কাজে গতি আনতে মরিয়া, এই বদলির তালিকা তারই প্রমাণ। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থেই এই রদবদল ঘটানো হয়েছে ৷ তবে আমলা মহলের একাংশের মতে, নতুন সরকারের নীতি ও ভাবনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতেই এই বদল ৷ বিজ্ঞপ্তিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের সচিব এবং প্রধান সচিবদের দায়িত্ব একলপ্তে বদলে দেওয়া হয়েছে ৷
এই রদবদলের তালিকায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নামগুলির অন্যতম হলেন 1993 ব্যাচের আইএএস অফিসার অনুপ কুমার আগরওয়াল। জলপাইগুড়ি ডিভিশনের কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে তাঁকে কর্মী ও প্রশাসনিক সংস্কার এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৷
অন্যদিকে, 1994 ব্যাচের বর্ষীয়ান আমলা তথা মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের উন্নয়নমূলক কাজের প্রিন্সিপাল কো-অর্ডিনেটর নন্দিনী চক্রবর্তীকে পাঠানো হয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং জৈব-প্রযুক্তি দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পদে। পাশাপাশি আবাসন দফতরের অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলাবেন তিনি। এই পদক্ষেপকে প্রশাসনের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্যের বড়সড় রদবদল হিসেবেই দেখা হচ্ছে ৷
পরিবর্তন এসেছে ভূমি এবং খাদ্য দফতরের মতো সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যুক্ত বিভাগগুলিতেও। প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের কমিশনার সুরেন্দ্র গুপ্তাকে ভূমি ও ভূমি সংস্কার এবং উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দফতরের প্রধান সচিব পদের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৷ অন্যদিকে, খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের প্রধান সচিব পারভেজ আহমেদ সিদ্দিকীকে সরিয়ে পাঠানো হয়েছে স্টেট গেজেটিয়ার্স-এ। তাঁর জায়গায় খাদ্য ও সরবরাহ দফতরের সচিব পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে 2004 ব্যাচের আইএএস অফিসার জগদীশ প্রসাদ মিনাকে ৷ যিনি এতদিন নারী ও শিশু কল্যাণ দফতরের দায়িত্বে ছিলেন।
পরিবহণ দফতরের শীর্ষ পদেও আনা হয়েছে নতুন মুখ। স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বনিযুক্তি দফতরের প্রধান সচিব রবি ইন্দর সিংকে এবার পরিবহণ দফতরের প্রধান সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে ৷ সেচ ও জলপথ দফতরের প্রধান সচিব পদে আনা হয়েছে রাজেশ কুমার সিনহাকে। রাজভবন ও নবান্নের সমীকরণ বজায় রাখতে রাজ্যপালের সচিব সৌমিত্র মোহনের ওপর ভরসা রেখেছে নতুন সরকার। তিনি নিজের পদের পাশাপাশি এবার থেকে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব পদের অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলাবেন। কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন দফতরের প্রধান সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন রাজীব কুমার।
মহিলা আমলাদের ক্ষেত্রেও একগুচ্ছ রদবদল চোখে পড়েছে ৷ স্বাস্থ্য দফতরের সচিব মৌমিতা গোদারা বসুকে নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ দফতরের সচিব করা হয়েছে ৷ আইসিডিএস-এর ডিরেক্টর রচনা ভগতকে পদোন্নতি দিয়ে শ্রম দফতরের সচিব পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৷ পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নীলম মীনাকে তাঁর বর্তমান পদের সঙ্গেই পরিবেশ দফতরের প্রধান সচিব পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ৷
প্রশাসনিক মহলের মতে, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে কাজে কোনও রকম ঢিলেমি বরদাস্ত করা হবে না। পুলিশ মহলে রদবদলের পর নবান্নের শীর্ষস্তরের এই আমলা-বদল আসলে রাজ্য প্রশাসনকে আরও গতিশীল এবং দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, এই ব্যাপক রদবদল মহাকরণ থেকে নবান্ন— রাজ্যের শাসনযন্ত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

