রাজ্যজুড়ে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ বা ‘Paschimbanga Divas’ পালন করার সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নবান্ন সূত্রে খবর, গত 3 জুন রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরেই গত 10 জুন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় রাজ্যের সমস্ত জেলার সদর দফতর এবং সমস্ত ধরনের সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আগামী 20 জুন এই ঐতিহাসিক দিনটি উদযাপনের জন্য একটি বিশদ রূপরেখা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। নবান্নের প্রশাসনিক মহলের স্পষ্ট বার্তা, বাংলার গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সুদীর্ঘ ইতিহাস এবং যে ঐতিহাসিক আইনসভাগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জন্ম হয়েছিল, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবান্ন থেকে জারি করা ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, এই উদযাপনের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং বাংলার বিভাজনের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা ও তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেওয়া। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলার এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের কথা পৌঁছে দিয়ে তাদের মধ্যে এক গভীর দায়িত্ববোধ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সর্বজনীন ঐক্যের চেতনা জাগ্রত করতে চাইছে রাজ্য সরকার। নবান্ন মনে করছে, এই ধরনের সম্মিলিত উৎসব ও আলোচনা সভার মাধ্যমে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রতি মানুষের সংযোগ আরও নিবিড় হবে, যা পরোক্ষভাবে সামাজিক বন্ধন এবং যৌথ দায়বদ্ধতাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করবে। সরকারি নির্দেশিকা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, এই উৎসবের রূপায়ণকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে— জেলা স্তরের উদযাপন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির কর্মসূচি। জেলা স্তরে যাবতীয় অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে উচ্চপর্যায়ের ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস উদযাপন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির শীর্ষে অর্থাৎ চেয়ারম্যান পদে থাকবেন সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক। এছাড়া কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জেলা পুলিশ সুপার অথবা পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত জেলাশাসক, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক, জেলা শিক্ষা আধিকারিক এবং পুরসভার কমিশনার বা পুর-নির্বাহী আধিকারিকরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে জেলার সাংসদ ও বিধায়কদেরও এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার সমন্বয়কারী বা সদস্য সচিব হিসেবে কাজ করবেন জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক। এই কমিটির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জেলা সদরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব, তথ্যচিত্র বা আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশীদারিত্ব বাড়াতে স্থানীয় গ্রন্থাগার ও জাদুঘরগুলির মাধ্যমেও বিশেষ প্রচার চালানো হবে। প্রতিটি জেলার মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এলাকার মন্ত্রী ও বিধায়কদের উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রশাসনিক এই নির্দেশিকায় স্কুল-কলেজ তথা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। আগামী 20 জুন রাজ্যের সমস্ত সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং সরকার পোষিত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক কলেজ এবং আইটিআই-তে বিশেষ সমাবেশের আয়োজন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ স্তরে এই দিনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট নিয়ে বিশেষ বক্তৃতামালার আয়োজন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা ও ইতিহাস সচেতনতা বাড়াতে প্রবন্ধ রচনা, বিতর্ক সভা এবং কুইজ প্রতিযোগিতার মতো বিভিন্ন কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে বাংলা ও ইংরেজি— উভয় ভাষাতেই তথ্যভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী ও বুকলেট প্রকাশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে। এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বজায় রাখতে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রতি বছর এই দিনটি স্মরণে বার্ষিক স্মারক বক্তৃতার স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।



