একুশের সমাবেশের ঠিক আগের রাতে রণক্ষেত্র বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম চত্বর । কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তৈরি হওয়া তৃণমূলের সভামঞ্চে ব্যাপক ভাঙচুরের অভিযোগ উঠল বিজেপির বিরুদ্ধে ।অভিযোগ, সোমবার গভীর রাতে বাইক বাহিনী নিয়ে এসে তাণ্ডব চালিয়েছে গেরুয়া শিবির । এই গোটা ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । সরাসরি রাজ্য সরকার এবং পুলিশের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি ।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে তৃণমূলকে 21 জুলাই শহিদ দিবসের সভার অনুমতি দেয় । আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইয়ে এই আইনি ‘জয়’ এসেছিল । আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পরেই জোরকদমে চলছিল মঞ্চ বাঁধার কাজ ।সভার আগের দিন অর্থাৎ, সোমবার 20 জুলাই বিকেলে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে সভাস্থল পরিদর্শনে যান নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । কিন্তু রাতের দিকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় । সভাস্থলে হামলার খবর পেয়েই আর কালক্ষেপ করেননি তিনি । দোলা সেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের সঙ্গে নিয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান তৃণমূল নেত্রী । ভাঙা মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে সরাসরি বিজেপি ও পুলিশকে কাঠগড়ায় তোলেন মমতা ।তিনি বলেন, “রাত সাড়ে দশটা নাগাদ এক ক্রিমিনালের নেতৃত্বে 60-65 জনের বাইক বাহিনী এসে সভাস্থল ভাঙচুর করে । ছাত্র-যুবদের উপরে হামলা চালায় ।” তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগ, শুধু মঞ্চ ভাঙচুর নয়, সভাস্থলের বিদ্যুতের লাইন এবং মাইকের কানেকশনও সম্পূর্ণ কেটে দেওয়া হয়েছে । ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে সমস্ত ব্যানার ও পোস্টার । বৃষ্টির মধ্যে যে ডেকোরেটর এবং কর্মীরা কাজ করছিলেন, তাঁদেরও ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয় । অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরেও হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি ।এই রাতের তাণ্ডবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর দাবি, কলকাতা হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল সভাস্থলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের । তা সত্ত্বেও কেন পুলিশি নিরাপত্তা সরিয়ে নেওয়া হল, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি । পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “কলকাতা হাইকোর্ট যেখানে অর্ডার দিয়ে বলেছে, পুলিশকে আইন-শৃঙ্খলা দেখতে হবে, সেখানে হঠাৎ করে সবাই পালিয়ে গেল ! আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি ।”
হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করার দায়ে সরাসরি আইনি পদক্ষেপের পথে হাঁটার কথা ঘোষণা করেছেন তৃণমূল নেত্রী । ক্ষুব্ধ মমতার কথায়, “পুলিশ ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করতে বলব । আমাদের কি পাহারা দেওয়ার জন্য বসে থাকতে হবে ?” পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে অতিসক্রিয়তা এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি জানান, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় একুশের সমাবেশে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে কর্মী-সমর্থকদের ।এই বিষয়ে তিনি বলেন, “আইসি, এসপি গিয়ে শহিদ পরিবারের বাড়ি ঘেরাও করে বসে রয়েছে ।”রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে দিল্লির পুলিশের সঙ্গে এখানকার পুলিশের তুলনা টানেন মমতা । দিল্লিতে বিরোধী শিবিরের ওপর পুলিশি পদক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করেন । কটাক্ষের সুরে তিনি বলেন, “দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে কী করেছে আপনারা দেখেছেন, এখানেও তাই করেছে ।” তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে 14 হাজারের বেশি মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে । এই অবস্থাকে ‘মধ্যরাতের কালো ইতিহাস’ বলে আখ্যা দিয়ে আগামী দিনে রোজ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন মমতা । গোটা ঘটনায় জাতীয় স্তরের বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র শরিক দলগুলির কাছেও সরব হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী ।
তিনি জানান, দেশের সমস্ত আঞ্চলিক দল এবং গণতান্ত্রিক শক্তির উচিত একজোট হয়ে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করা । যদিও এই মারাত্মক অভিযোগের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকার বা কলকাতা পুলিশের তরফে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি ।

